গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রূপগঞ্জ ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দীর্ঘদিন চিকিৎসকের পদ শূন্য, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট, সীমিত জনবল এবং সেবা কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার রূপগঞ্জ ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসেন কয়েক শতাধিক মানুষ। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, জরুরি রোগী কিংবা ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের দাবি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে বেশির ভাগ সময় প্যারাসিটামল ও অ্যান্টাসিড ছাড়া প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকসহ মোট পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ রয়েছে। তবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র দুজন—একজন ফার্মাসিস্ট এবং একজন সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো)। কয়েক বছর ধরে এমবিবিএস চিকিৎসকের পদটি শূন্য থাকায় চিকিৎসাসেবার বড় একটি অংশই কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই শতাধিক রোগী এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলেও অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিত সেবা পান না। দুর্ঘটনায় আহত রোগী এলে প্রাথমিক চিকিৎসার পরিবর্তে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়। ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রয়োজনীয় ওষুধও অধিকাংশ সময় পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা থাকার কথা থাকলেও অনেক সময় কর্মীরা নির্ধারিত সময়ের পরে আসেন এবং সময় শেষ হওয়ার আগেই কার্যক্রম গুটিয়ে নেন। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক রোগী বিনা চিকিৎসায় ফিরে যেতে বাধ্য হন।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগী রহিম মিয়া বলেন, জ্বর ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ পাইনি। পরে বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে যদি সবকিছু বাইরে থেকে কিনতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।
রোগীর স্বজন মরিয়ম বেগম বলেন, আমার স্বজন অসুস্থ হয়ে এখানে এসেছিলেন। চিকিৎসক না থাকায় আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে বলা হয়েছে। দূরে যাওয়ায় সময়ও নষ্ট হবে, খরচও বাড়বে।
একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে চিকিৎসা নিতে আসা সালমা আক্তার বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ, সরকারি হাসপাতালে আসি বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধের আশায়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে আমাকে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা সঠিক চিকিৎসা কোথায় পাব?’
স্থানীয় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র করেছে। কিন্তু এখানে যদি নিয়মিত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকে, তাহলে মানুষ এই সেবার সুফল পাবে কীভাবে? এতে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন রূপগঞ্জ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। রোগীদের পিসি, অ্যান্টাসিড, প্যারাসিটামল, ডাইক্লোফেনাক, অ্যামব্রোক্সল, লোসারটান, মেট্রোনিডাজল, সালবিউটামলসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। তবে এমবিবিএস চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কাটা-ছেঁড়া বা কিছু জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বাদল কুমার শাহা বলেন, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে সেবা বা ওষুধ বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বদলিজনিত কারণে বর্তমানে এমবিবিএস চিকিৎসকের পদটি শূন্য রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেসব ওষুধ থাকে, সেগুলোর মধ্যে যতটা সম্ভব উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেও সরবরাহের চেষ্টা আমরা করে থাকি। যদি দায়িত্বগত অবস্থায় কেউ অনিয়মের চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রূপগঞ্জ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে দ্রুত এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ, জনবল বৃদ্ধি এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা হবে। তাহলেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের ন্যায্য ও কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।








