নারায়ণগঞ্জ ।
,

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে‘মুন্নী বাহিনী’র হুমকিতে চরম আতঙ্কে একটি অসহায় পরিবার

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও পুলিশের ওপর হামলার একাধিক মামলার আসামি কুখ্যাত ‘মুন্নী বাহিনী’ ও তাদের সহযোগীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। সম্প্রতি তাদের পৈশাচিক হামলায় গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন প্রবাসী মোঃ শওকত প্রকাশ সৈকত। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হলেও মূল আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি।

থানায় লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নিহত প্রবাসী শওকত দীর্ঘ ২৫ বছর প্রবাসে ছিলেন। দেশে ফেরার পর থেকেই আসামিরা তার কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় গত বছরের জুন মাসে শওকতের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রথম হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। এসময় তাকে চাপাতি দিয়ে বাম পায়ে কুপিয়ে দিয়ে গুরুত্বর জখম করে সন্ত্রাসীরা। পরে শওকতের চিৎকারে পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এলে তাদের ওপরও চড়াও হয় সন্ত্রাসীরা। এসময় আহত শওকতের সামনেই তার পরিবারকে বেধড়ক পিটুনি দিয়ে আহত করে করা হয়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শওকত বন্দর থানায় মামলা করতে গেলে তার মামলা না নিয়ে উল্টো হামলাকারি মুন্নী বাহিনীর মামলা গ্রহণ করে থানা পুলিশ। এবং ওই মামলায় রাতেই অভিযান চালিয়ে শওকতের পরিবারকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এখানে থেমে থাকেননি আহত শওকত। থানায় প্রতিকার না পেয়ে তিনি বিচারের আশায় নারায়ণগঞ্জ আদালতের দ্বারস্থ হন এবং সেখানে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ২৭৩।

পরবর্তীতে মামলা করার জেরে গত ২১ অক্টোবর শওকতকে আবারও রামদা, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করে ১নং আসামি মহসিন ওরফে রহিম, সোহেল, লাকী ও মুন্নি বেগমসহ তাদের সহযোগীরা। এ ঘটনায় বন্দর থানায় আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার নং-৯(১১)২৫।

এরপর আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ফেরার পথে চানমারি এলাকায় আসামীদের ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা শওকতকে পুনরায় মারধর করে। ক্রমাগত শারীরিক নির্যাতন ও বাম পায়ে চাপাটির কোপের আঘাতে ক্ষতস্থানে সৃষ্ট ইনফেকশনের কারণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৪ জুলাই শওকত মৃত্যুবরণ করেন।

এদিকে শওকতের মৃত্যুর পরও নিস্তার পায়নি তার পরিবার। গত ১৯ জুলাই তার ১৮ বছর বয়সী কন্যা জান্নাত আরা কবরস্থানে যাওয়ার পথে আসামিরা তাকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের সামনে আসামিরা হুমকি দিয়ে বলে, ”তোদের পিতাকে তো হত্যা করেছি, এবার তোকে সুযোগমতো পেলে খুন-জখম করে লাশ গুম করে ফেলবো।” এ ঘটনায় নিহত শওকতের স্ত্রী মৌসুমি বেগম (৪১) বাদী হয়ে বন্দর থানায় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলো, মহসিন ওরফে রহিম (৪০), আব্দুল মতিন (৫৫), সোহেল (৩৫), লাকী (৩০), আমির হোসেন (৩৫), মুন্নি বেগম (৩০), হনুফা বেগম (৫৫), ছুনিয়া বেগম ওরফে সুইটি (৩১), সোহেল (৪০), সুতমিতা (১৮) ও সোনিয়া (২৫)।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত আসামিরা একাধারে কুখ্যাত ‘মুন্নী বাহিনী’র সদস্য এবং এলাকার সক্রিয় মাদক কারবারি। এর আগে মাদকমুক্ত অভিযানে আসা বন্দর থানা পুলিশের ওপর এই বাহিনী সংঘবদ্ধ হামলা চালায়। উক্ত হামলায় বন্দর থানার এক সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) সহ বেশ কয়েকজন কনস্টেবল গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় বন্দর থানায় একটি মামলা (মামলা নং-৪৭১০/২৫) দায়ের করা হলে তৎকালীন ওসির নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে রহস্যজনকভাবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় অপরাধ জগতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

অভিযোগে আরও জানা যায়, চিহ্নিত সন্ত্রাসী মতিন, রাহিম, সোহেল ও লাকীরা ইতোপূর্বে রাজধানীর ডেমরা এলাকায় একটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল। ডেমরায় খুন করার পর তারা পালিয়ে এসে বন্দরের সোনারকান্দা বেপারী পাড়া এলাকায় ঘাটি গাড়ে এবং পূর্বের মতো হত্যা, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা বহাল রাখে। তাদের অব্যাহত তাণ্ডবে পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে এবং সাধারণ মানুষ তটস্থ ও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসী অবিলম্বে এদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শওকতের মৃত্যুর ঘটনা ও মেয়েকে হত্যার হুমকির বিষয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ করা হলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তার করছে না। বর্তমানে মতিন, রাহিম, সোহেল, লাকী ও সুইটিরা পলাতক থাকলেও ‘মুন্নী বাহিনী’র সদস্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং নতুন করে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো আসামিদের অব্যাহত হুমকিতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে নিহত শওকতের পরিবার। নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রবাস ফেরত শওকত হত্যার সুষ্ঠু বিচার ও সকল সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তারে নারায়ণগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপার (এসপি)-এর জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন নিহতের স্ত্রী ও পরিবারবর্গ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >