জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে নারায়ণগঞ্জে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক সংকট, নদী বন্দরে ক্রেন বন্ধ এবং পণ্য আনলোড স্থবির হয়ে পড়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশ জুড়ে খাদ্য ও কৃষি পণ্যের সংকট দেখা দিতে পারে।
বেকায় দায় পাম্প মালিকরা : জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে লোকসানের মুখে পড়েছেন ফতুল্লা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের পেট্রল পাম্প মালিকরা। সরকারি রেশনিংয়ের আওতায় চাহিদার তিন ভাগের এক ভাগ তেল পাচ্ছেন তাঁরা। পাম্প মালিকদের অভিযোগ, তেল থাকুক বা না থাকুক, পাম্প পরিচালনার খরচ কিন্তু একই। পাগলা এলাকার জননী পাম্পের ম্যানেজার মোহাম্মদ আরমান মিয়া জানান, তাদের প্রতিদিনের চাহিদার ১০ হাজার লিটারের বিপরীতে বরাদ্দ মেলে মাত্র তিন হাজার লিটার। আর গত তিন দিন ধরে সেই সামান্য বরাদ্দও পাওয়া যাচ্ছে না। একই চিত্র দেখা গেছে চাষাঢ়ার প্রান্তিক ও বলাকা পেট্রল পাম্পেও।
অচল ক্রেন, আটকে আছে লাইটার জাহাজ : নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতি ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকাংশেই নির্ভরশীল নদী বন্দরের ওপর। কিন্তু ডিজেলের অভাবে এখন অচল হয়ে পড়েছে পাগলার মাদরাসা ঘাট, দাপা ঘাট ও মুন্সী খোলা ঘাটের ক্রেন গুলো। ফলে জাহাজ থেকে পণ্য নামানো প্রায় বন্ধ।
আলীগঞ্জ মাদরাসা ঘাটের ক্রেনের মালিক মোকারম সরদার জানান, ডিজেল না পাওয়ায় ক্রেন চলছে না। বর্তমানে ভুসি, ভুট্টা, গম ও সার নিয়ে ৩০টি লাইটার জাহাজ ঘাটে আটকে আছে। শ্রমিক দিয়ে অল্প কিছু পণ্য নামানো হলেও মূল কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ। সার আমদানি কারক প্রতিষ্ঠান মানামা ট্রেডার্সের প্রতিনিধি আরজু জানান, পণ্য নামানোর উপায় না থাকায় বিপুল পরিমাণ সার জাহাজে আটকা পড়ে আছে। পাশা পাশি সরবরাহ করতেও ট্রাকের সংকটের কারণে বিপদে পড়ে আছি।
বাড়ছে পরিবহন ভাড়া : তেলের জন্য ট্রাক চালকদের ভোগান্তি চরমে। পঞ্চবটি পরিবহন ট্রান্স পোর্টের মালিক সোহাগ
বলেন, ‘আগে প্রতিদিন আমাদের এখানে পাঁচটি ট্রান্স পোর্ট মিলে ২০টি ট্রাকে পণ্য পরিবহনের জন্য আমরা পাঠাতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থি তিতে ট্রাকই পাচ্ছি না, তাই দিনে চার-পাঁচটি ট্রাকের বেশি পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রিপে পাঠাতে পারি না।’
ট্রাক মালিক জিতু বলেন, তেলের সংকটে ট্রাক ভাড়া টন প্রতি এক হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবু তেল না থাকায় ট্রাকের ট্রিপ নিচ্ছি না। আগে প্রতি সপ্তাহে তিনটি ট্রিপ (আসা-যাওয়া) নিতে পারতাম, কিন্তু বর্তমানে একটির বেশি ট্রিপ নিতে পারছি না। নিজেদের এলাকায় দু-তিন দিন বসে থেকে তেল পেলেও দূরের জেলাগুলোতে তেল পাওয়া দুষ্কর, তাই দূরে ট্রিপ পাঠাচ্ছি না।’
সারের সরবরাহ ব্যাহত : দেশের সারের প্রধান তিনটি মোকামের একটি হলো নারায়ণগঞ্জ। এখান থেকে ২৫টি জেলায় সার সরবরাহ করা হয়। মানামা গ্রুপের ম্যানেজার আরজু জানান, আগে যেখানে প্রতিদিন ১০০টি ট্রাক সার নিয়ে বিভিন্ন জেলায় যেত, এখন তা কমে ৩০টিতে নেমে এসেছে। আর তিন দিন ধরে পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় এই সংখ্যা আরো কমেছে। কৃষকের জন্য সারের সময়মতো সরবরাহ জরুরি, যা এখন ঝুঁকির মুখে। একই পরিস্থিতি নিতাইগঞ্জের চাল ও খাদ্য শস্য আড়ত গুলোতে। আনোয়ার ট্রেডিংয়ের মালিক নিজামুদ্দিন রতন জানান, ট্রাক সংকটের কারণে ঢাকার বাইরে ১৫টি জেলায় চাল পাঠানো যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, শহরের দুটি পাম্পের বিষয়ে অবগত ছিলাম, তবে পাগলার পাম্প গুলোর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হবে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।







