নারায়ণগঞ্জ । শনিবার
১৭ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর নাম “টিপু”

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব এডভোকেট মো. আবু আল–ইউসুফ খান টিপু যেনো নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর নাম। তৃণমূল থেকে হুট করেই উঠে আসা এই নেতা বেশিরভাগ সময়েই ছিলেন আলোচনা – সমালোচনায়। অদ্ভুত বক্তব্যে কখনো নিজ দল বিএনপিকেই করেছেন তুচ্ছ আবার কখনো নিজেই হয়েছেন দিশেহারা কখনো হয়েছেন ছন্নছাড়া।

‘কেউ সংসদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ নিজের স্বার্থের রাজনীতি করে’ মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এমন মন্তব্যে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির শীর্ষ নেতাদেরকে নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এই টিপু। বিভিন্ন সময়ে দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়েও বিএনপিকে তুমুল সমালোচনায় এনেছিলেন এই নেতা। দলের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছেও বিচার তুলেছিলেন টিপু। ১৯শে নম্ভেবর-২৫ইং নাঃগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র এলাকায় দল থেকে যে তিনটি বহিস্কার প্রত্যাহার করা হয়েছিলো তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন তিনি এবং বিএনপি ন্যায় বিচার করে না বলেও আক্ষেপ করে আল্লাহর কাছে নিজ দলের বিরুদ্ধেই বিচার দিয়েছিলেন টিপু।

আওয়ামী লীগের দোসর হাইব্রিড মাসুদুজ্জামান এমন আখ্যা দিয়ে টিপু বলেছিলেন, হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা বসন্তের কোকিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের হাইব্রিড দোসরকে আমরা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে চাই না। দলের ভেতর থেকে ত্যাগী নেতাকে আমরা চাই। ‘নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে বাঁচাও, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনকে বাঁচাও’ এমন স্লোগানে মুখোর করেছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনকে। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনীত প্রার্থী মাসুদুজ্জামান মাসুদকে নিয়ে করেছেন তীব্র সমালোচনা। কখনো মাসুদকে আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর আখ্যা দিয়েছেন আবার কখনো বলেছিলেন মোটা অংকের টাকায় মাসুদ কিনে নিয়েছেন এই আসনের মনোনয়ন। ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্যে বিভিন্ন সময়ে মাসুদুজ্জামান মাসুদকে জর্জরিত করেছিলেন টিপু। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মনোনয়ন পুনর্বিবেচনার আবেদনও জানিয়েছিলেন এই টিপু। কিন্তু বারংবার সমালোচনার তুঙ্গে তুলে দেয়া সেই মাসুদুজ্জামান মাসুদের পক্ষে আচমকাই নিজের শক্ত অবস্থান তৈরী করেছেন টিপু। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে চলছে কানাঘোসা কেউ কেউ তো বলছেন হয়তো মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পক্ষ নিয়েছেন টিপু।

একসময় আওয়ামী লীগের নিবেদিত কর্মী হিসেবে পরিচিত শিখন সরকার শিপনকে সাখাওয়াত ও টিপু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে আবির্ভূত করেছিলেন। এর পরপরেই ফুসে উঠেছিলো তৃণমূলসহ বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীরা।

মহানগর বিএনপির একটি সূত্র জানায়, টিপুর বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর মামলা বাণিজ্যের অভিযোগও উঠেছিলো । ভুক্তভোগীদের প্রভাবিত করে তিনি মামলায় বিভিন্নজনের নাম সংযুক্ত করতেন। এমনকি কয়েকজন বিএনপি কর্মীর নামও তিনি একাধিক মামলায় দিতেন, যারা তার বলয়ের বাইরে গিয়ে রাজনীতি করতো। এছাড়া, বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামিদের জামিনেও তিনি সহযোগিতা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমে টিপুর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের লোকজনকে আশ্রয় দেওয়া, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার আসামিদের জামিনে সহযোগিতা, মামলা বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিলো।

জেলা বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা টিপুর উপর বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ২৯ জুলাই ২০২৩ সালে ঢাকার প্রবেশপথে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচীকে ঘিরে টিপুর একক সিদ্ধান্তে দলের পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিলো। সেদিন শুধুমাত্র টিপুর ভুল ও একক সিদ্ধান্তের কারনে পুলিশ গুলি শুরু করেছিলো গুলিবিদ্ধ হয়েছিলো জেলা বিএনপি, ফতুল্লা থানা বিএনপি ও যুবদলের অনেক নেতাকর্মী। সেদিন চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু। নারায়ণগঞ্জ জেলা ট্রাক, ট্যাংকলরী, ও কাভার্ডভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সংগঠনটি দখলে নিয়ে নিজের অনুসারীদের বসাতে চেয়েছিলেন এতে বাধা পেলে শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যসচিব তাজুল ইসলাম শামীমকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর অভিযোগ উঠেছিলো এই টিপুর বিরুদ্ধে।

চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছিলো আবু আল ইউসুফ খান টিপুর বিরুদ্ধে। গত ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরের নবীগঞ্জ এলাকায় নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের হাতে মারধরের শিকার হন এ বিএনপি নেতা। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছেলে আবুল কাউসার আশা ও ভাই আতাউর রহমান মুকুলকেও আসামি করেছিলেন টিপু। কিন্তু পরবর্তীতে এই আশা ও মুকুলের সাথেও টিপুর সখ্যতা দেখা গিয়েছে। বিএনপির বিভিন্ন নেতাদের অভিযোগ, দলের ত্যাগী অনেক নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করে বিভিন্ন ইউনিট কমিটি ঘোষণা করেছিলেন সাখাওয়াত ও টিপু। পদবাণিজ্য ও চাঁদাবাজির কারণে তাদের উপর ক্ষুব্দ ছিল দলের কর্মীরা। টিপুর উপর হামলা ছিলো তারই বহিঃপ্রকাশ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >