নানা কারণেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। এবার তাকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ ও সমালোচনা চলছে। প্রভাবশালী এই যুবদল নেতার ছত্রচ্ছায়ায় ফতুল্লার মাসদাইরে ওসমান পরিবারের অন্যতম হাতিয়ার তথা জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষ নেতাদের ব্যবসা বাণিজ্য সচল রয়েছে বলে গুঞ্জন রটার পরই বিএনপির তৃণমূলে এই ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগের সাবেক ওই শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ সম্পর্কের দিক থেকে রনির ভাই হওয়ার সুবাদে তারা বিদেশে পালিয়ে থেকেও নির্বিঘ্নে ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে বিতর্কিত ওসমান পরিবারের সান্নিধ্যে এসে রাতারাতি ভাগ্য বদলেছেন অনেকেই। শামীম ওসমান তো বটেই; পুত্র অয়ন ওসমানের পদলেহন করেও অনেকে শূন্য থেকে হয়েছেন শতকোটি টাকার মালিক। এই তালিকায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আশরাফুল ইসলাম রাফেল প্রধান, তার ভাই রাসেল প্রধান ও হাবিবুর রহমান রিয়াদ অন্যতম। অয়ন ওসমানের বন্ধু পরিচয়ে ধরাকে সরা জ্ঞ্যান করে চলা এই তিন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার প্রভাবে তটস্থ থেকেছে নারায়ণগঞ্জ শহর কিংবা আশপাশের থানা এলাকাগুলো। বিশেষ করে শিল্পনগরী ফতুল্লায় তাদের দুঃশাসনের পাশাপাশি ঝুট, ইন্টারনেট, ডিস, টেন্ডার বাণিজ্য সহ বিভিন্ন সেক্টরের ব্যবসা ছিলো তাদের কব্জায়।
গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে সারা দেশেই আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া এসকল প্রভাব বিস্তারমূলক ব্যবসা-বাণিজ্যগুলো বিএনপি নেতাদের নিয়ন্ত্রণে আসে, সেখানে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকায় ঘটেছে উল্টো চিত্র! কেননা, ৫ আগস্টের পর সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রাফেল ও রিয়াদ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমালেও মাসদাইরে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সকল সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেই আগের মতই। দেশের বাহিরে পলাতক থেকেও এখনও আড়াল থেকে মাসদাইরের ইন্টারনেট ব্যবসা চালাচ্ছে রিয়াদ, রাফেল ও তার ভাই রাসেল প্রধান।
অভিযোগ রয়েছে, রিয়াদের নিকটাত্মীয় (মামাতো ফুপাতো ভাই) জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি। ফলে বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী এই যুবদল নেতার সাথে সমঝোতা করে বিদেশে বসেও মাসদাইরের ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রেখেছে অয়ন ওসমানের এই ঘনিষ্ঠ সহচররা। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপির পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মী এবং তৃণমূলে ব্যপক ক্ষোভ দেখা দিলেও রনির বিরাগভাজন হওয়ার শঙ্কায় প্রকাশ্যে কেউ প্রতিবাদ করছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্রগুলো। তবে যেকোনো সময়ে ঘটতে পারে ক্ষোভের বিস্ফোরণ!
জানা গেছে, অয়ন ওসমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত রাফেল ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। আর হাবিবুর রহমান রিয়াদ ছিলেন মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। এছাড়াও রাফেল প্রধানের ভাই রাসেল প্রধান ছিলেন মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক।
তথ্য অনুযায়ী, রাফেল প্রধানকে ঘিরে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নথিভুক্ত অভিযোগগুলোর একটি উঠে আসে ২০২৩ সালের জুনে। ইন্টারনেট ব্যবসাকে ঘিরে ২০২৩ সালের ৩ জুন রাতে নারায়ণগঞ্জের মাসদাইর এলাকায় ইফাদুর রহমান তুষারের বাড়িতে হামলা ও গুলি বর্ষন করে রাফেল প্রধান ও তার ভাই রাসেল প্রধান সহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী। অর্থাৎ মাসদাইরের ইন্টারনেট ব্যবসা নিয়ে রাফেল পরিবারের বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অভিযোগ নতুন নয়। তবে আগে পেশীশক্তি ব্যবহার করলেও বর্তমানে জেলা যুবদলের প্রভাবশালী নেতা রনির ক্ষমতা ও আত্মীয়তাকে ব্যবহার করছে রাফেল ও রাসেল প্রধান।
স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর রাফেল-রিয়াদ সরাসরি এলাকায় না থাকলেও মালয়েশিয়ায় রনির সাথে সমঝোতায় বসে কেবল ইন্টারনেটই নয় বরং মাসদাইরের বিভিন্ন শিল্পকারখানার ঝুট বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে রিয়াদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে গুরুতর আইনি বিষয় সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নারায়ণগঞ্জের ১০ জন নিহতের ঘটনায় শামীম ওসমানসহ যেই ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়া হয়েছে, ওই ১২ জন আসামীর তালিকায় রয়েছে হাবিবুর রহমান রিয়াদের নামও। একই ভাবে রাফেল ও তার ভাই রাসেল প্রধানের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক হত্যা মামলা। গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামীও তারা। ক্ষমতায় থাকাবস্থায় তাদের হাতে স্থানীয় বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা যেখানে মামলা-হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেখানে তারা ক্ষমতা হারিয়ে ও হত্যা মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বিদেশে আয়েশি জীবন-যাপন করেও যুবদল নেতা রনির হাত ধরে নির্বিঘ্নে নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ায় চাপা ক্ষোভে ফুঁসছে বিএনপির কর্মী সমর্থকরা। শেষ পর্যন্ত এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবে কিনা- তা নিয়ে আলোচনা চলছে রাজনীতিকাঙ্গনে।
এদিকে এই বিষয়ে মশিউর রহমান রনির বক্তব্য গ্রহণের জন্য তাকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে রনির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।







