জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও অনুদানের জন্য সরকারিভাবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হলেও নারায়ণগঞ্জে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আহত সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর কোনো সহায়তা বা স্বীকৃতি মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের দাবি, গত দুই বছরে স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর পক্ষ থেকে তাদের খোঁজখবরও নেওয়া হয়নি।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে চলমান ছাত্র-জনতার আন্দোলন নারায়ণগঞ্জে ১৮ জুলাই তীব্র রূপ ধারণ করে। ভোর থেকেই শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন। সকাল ৯টার পর শহরের ২ নম্বর রেলগেট থেকে চাষাড়া গোলচত্বরে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টার পর পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ শুরু হলে পুরো শহর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সেই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন। আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ কভার করতে গিয়ে একাধিক সাংবাদিক হামলা ও সহিংসতার শিকার হন।
জাগো নিউজ২৪-এর জেলা প্রতিনিধি এবং নিউজ নারায়ণগঞ্জের স্টাফ রিপোর্টার মোবাশ্বির হোসেন শ্রাবণ জানান, ১৮ জুলাই দুপুর আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে প্রেসিডেন্ট রোড এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সময় তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় পুলিশের ছোড়া একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি সড়কে লুটিয়ে পড়লে সহকর্মী সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করেন।
একই দিন দৈনিক নয়াদিগন্তের ফটোসাংবাদিক মনিরুল ইসলাম সবুজ বিবি রোডে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ছবি তুলতে গেলে হামলার শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয় এবং তাকে মারধর করা হয়। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে তিনি আহত হন। পরে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
পরদিন ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কভার করতে গিয়ে এনএএন টিভির স্টাফ রিপোর্টার শাহজাহান চৌধুরী মাসুম হামলার শিকার হন। তার দাবি, হামলাকারীরা রড ও হকিস্টিক দিয়ে তাকে মারধর করে। এতে তার মাথায় গুরুতর জখম হয় এবং একাধিক সেলাই দিতে হয়। পরে সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।
একই দিন বিকেলে ভুইঘর রূপায়ণ টাউন এলাকার সামনে দায়িত্ব পালনকালে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আল-আমিন প্রধানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা তাকে মারধরের পাশাপাশি তার ব্যবহৃত ক্যামেরা ও মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে এবং মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও সাংবাদিকদের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করা হয়।
আহত সাংবাদিকদের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তারা এখনো কোনো সরকারি তালিকাভুক্তির আওতায় আসতে পারেননি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসন এবং সামাজিক সংগঠনগুলো আন্দোলনে আহত ও নিহতদের পরিবারের খোঁজখবর নিলেও আহত সাংবাদিকদের বিষয়ে কার্যত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে তারা দাবি করেন।
তাদের ভাষ্য, জেলা প্রশাসন, জেলা তথ্য অফিস এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আহ্বানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হলেও এখনো ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বিষয়টি তাদের জন্য হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন তারা।
আহত সাংবাদিকরা বলেন, সাংবাদিকরা কোনো স্বীকৃতি বা সুবিধার আশায় নয়, বরং পেশাগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তবে রাষ্ট্র বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তথ্য চেয়ে নেওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তারা নিজেদের উপেক্ষিত মনে করছেন।
তারা আরও জানান, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নারায়ণগঞ্জের একটি স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম তাদের সম্মাননা দিলেও এরপর আর কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যদিও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আহত সাংবাদিকদের জন্য একটি সংবর্ধনা কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছিল।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, জুলাই আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আহত হওয়া সাংবাদিকদের যথাযথ স্বীকৃতি, তালিকাভুক্তি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা উচিত। তাদের দাবি, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এনওনিউজ টিভি







