নারায়ণগঞ্জ । বুধবার
২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫০ লাখ গিলে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা!
টাকার সময় চুপ, ইফতারে তেজ! ফতুল্লার ইফতার মঞ্চে বিস্ফোরণ, কথার বুমেরাংয়ে অবরুদ্ধ এমপি

ফাইল ছবি (১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪)

রাজনীতিতে স্মৃতিভ্রংশ এত দ্রুত হয়, ফতুল্লার ইফতার মঞ্চ যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ। হাত পেতে অনুদান নেওয়ার পরই কি বদলে গেল সুর? আর সেই বদলানো সুরেই কি জ্বলে উঠলো ফতুল্লার ইফতার মঞ্চ? রাজনীতির মঞ্চে কথার আগুন কখন যে দাবানলে রূপ নেয়, তারই নজির দেখলো নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাবাসী।

একসময় যার হাত থেকে ৫০ লাখ টাকার অনুদান নেওয়া হয়েছিল, সেই ব্যক্তিকেই প্রকাশ্যে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এনসিপির এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন। তার এই মন্তব্য ঘিরে ফতুল্লায় রীতিমতো বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এমন মন্তব্যের ফলাফলে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে ঘেরাও খোদ এমপি, প্রায় দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থা, এবং শেষমেশ পুলিশের হস্তক্ষেপে উদ্ধার!

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) সন্ধ্যায় ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় জামায়াত আয়োজিত ইফতার মাহফিলে এই নাটকীয় ঘটনার সূত্রপাত। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ পান এমপি আল-আমিন ও বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঞ্চে হাতেমকে দেখে আল-আমিন স্টেজে বসেননি। বক্তব্য দিতে গিয়ে সরাসরি বলেন, “আমি ফ্যাসিস্টের দোসরের সাথে এক মঞ্চে বসবো না।” এই বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাতেম অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করলে তার অনুসারীরা এমপিকে ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফতুল্লা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর এমপিকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।

ঘটনার পটভূমি ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ সালে বিকেএমইএ’র ঢাকা কার্যালয়ে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করেন মোহাম্মদ হাতেম।
সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সমন্বয়ক সারজিস আলম, এ কে এইচ আখতার হোসেন ও আরিফুল ইসলাম আদিবসহ সংশ্লিষ্টরা। সেদিন হাতেম শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসানও আহতদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। সেদিন যখন হাতেম শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্নের কথা বলেন তখন পাশে সংগঠনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকলেও কারও মুখে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ শব্দটি শোনা যায়নি।

টাকা নেয়ার সময় তখন কোথাও ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ তকমা শোনা না গেলেও এখন হঠাৎ এমন আক্রমণাত্মক ভাষা কেন ?এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো নারায়ণগঞ্জজুড়ে। কেউ কেউ বলছেন, যার হাত থেকে অনুদান নেওয়া হলো, তাকে তখন ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ বলা হয়নি কেন? অবস্থান বদলের এই নাটকীয়তা কি রাজনৈতিক কৌশল, নাকি ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাতেমের এক অনুসারী বলেন, ৫০ লাখে নীরবতা, মাইকে মহা-নীতিকথা ,অনুদান গ্রহণে আপত্তি নেই, ইফতারে আপত্তির ঝড়,নীতির এই সুপারম্যান কবে জন্মালেন?

নেটিজেনদের প্রশ্ন আরও জোরালো, “টাকা নেওয়ার সময় আপত্তি নেই, কিন্তু রাজনৈতিক মঞ্চে উপস্থিত থাকলেই আপত্তি?
এটা কি নীতির প্রশ্ন, নাকি সুবিধাবাদের নগ্ন প্রদর্শন”?

এদিকে ঘটনার পর আল-জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের (সামি) এক ফেসবুক পোস্টে তীব্র ব্যঙ্গ ছুড়ে দেন। তিনি লেখেন, ফ্যাসিস্টের দোসরদের হাত থেকে জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার জন্যে অর্থ গ্রহণ করা যাবে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সাথেও ফ‍্যাসিস্টের দোসর ট‍্যাগ দেয়া ওই ব্যক্তিকে নিয়ে একই মঞ্চে দাঁড়ানো হয়েছে, সদ‍্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা নিজেই তো এক মঞ্চে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলার আসামির পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন কিছুদিন আগেই (২৯ জানুয়ারি ২০২৬)।
কিন্তু একই ব্যক্তিকে (বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম) নিজ রাজনৈতিক জোট সঙ্গী (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি) এর ইফতার দাওয়াতে উপস্থিত থাকতে দেখে তাঁকে উদ্দেশ্য করে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ উক্তি করে নিজ হ্যাডম প্রকাশ করতে হইবে। তার পোস্টের শেষ বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগুন ধরিয়েছে—“প্যান্টের উপর জাইঙ্গা পরলেই কিন্তু সুপারম্যান হওয়া যায় না এমপি সাহেব।”

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অনুদান গ্রহণের সময় নীরবতা আর পরে প্রকাশ্য মঞ্চে তীব্র আক্রমণ, এটি আসলে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল-নির্ভর রাজনীতিতে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক বলয়ের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। তবে প্রকাশ্য মঞ্চে এমন তীব্র মন্তব্য এবং তার জেরে একজন সংসদ সদস্যের অবরুদ্ধ হয়ে পড়া—এটি নিঃসন্দেহে নজিরবিহীন।

স্থানীয়দের ভাষায়, এটি কেবল একটি মন্তব্যের ঘটনাই নয় বরং এটি একটি রাজনৈতিক দ্বিচারিতার উন্মোচন।
অনুদান গ্রহণের সময় নীরবতা, আর জনসমক্ষে তীব্র আক্রমণ, এতে করে এমপির রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েই উঠছে নানা প্রশ্ন।

ফতুল্লার সেই ইফতার মাহফিল এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সুবিধা পেলেই নীরব, আর সুযোগ বুঝে উচ্চকণ্ঠ।এমন রাজনীতির দায় কে নেবে? অনুদান থেকে অবরুদ্ধ হওয়া, এই নাটকীয় পালাবদল কি কেবল আবেগের বিস্ফোরণ, নাকি বড় কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের অংশ? উত্তরের অপেক্ষায় এখন পুরো শহর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >