রাজনীতিতে ‘ঝোপ বুঝে কোপ’ মারায় বেশ পটু ভাবা হয় গিয়াস উদ্দিনকে। সেই পটু ব্যক্তিই এবার ‘কোপ’ বসানোর মত নিরাপদ ‘ঝোপ’ খুঁজে পাচ্ছেন না কোথাও! অনিশ্চয়তার শঙ্কায় অনেকটা দিশেহারা হয়ে কখনো নারায়ণগঞ্জ-৩ আসন আবার কখনো ছুটেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে। দুই দিকে পা রাখলেও কোথাও সুবিধা করে উঠতে পারলেন না তিনি। সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ আসনে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে যখনই ফতুল্লায় ঝুঁকেছেন, তখনই বড় বিপত্তি হয়ে দাঁড়ালেন আসনটির প্রভাবশালী রাজনীতিক বীরমুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী।
আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী শাহ-আলমও আছেন একই বিপত্তিতে। রাজনীতিতে বসন্তের কোকিল খেতাব পাওয়া এই ব্যাবসায়ী নির্বাচন ঘিরে সরব হলেও একদিকে মনোনয়ন বাগাতে ব্যার্থ হয়েছেন, অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার গুঞ্জন তুললেও তার সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে আছেন মোহাম্মদ আলী। যিনি কিং মেকার খ্যাত প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ; অনেকে তাকে ভোটের মাঠের ম্যাজিসিয়ান বলেও জানেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটের প্রার্থী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মুফতি মনির হোসেন কাসেমীকে বিএনপির মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে- এ কথা এখন হলফ করে বলাই যায়। ফলে আসনটিতে ধানের শীষের মনোনয়ন চেয়ে আওয়াজ তোলা গিয়াস উদ্দিন ও শাহ-আলম উভয়েই থাকছেন দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিতদের তালিকায়।
বিএনপির বিশেষ কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, এমনটা আঁচ করতে পেরেই গিয়াস ও শাহআলম উভয়ে ভেতরে ভেতরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছেন। তাদের কথায় সেই ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়েছে বলে চারিদিকে গুঞ্জন চলছে।
সূত্রগুলোর দাবি, গিয়াস-শাহআলম দু’জনেই নাকি হিসেব কষেছেন যে, কাশেমীকে বিএনপি সমর্থন জানালেও তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে ভোটের মাঠে ধোপে টিকবে না জোটের প্রার্থী কাসেমী। সে ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র হলে ভোটের তরী পাড়ি দিতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না হয়তো! এমন সমীকরণে যখন এগোচ্ছিলেন দু’জন, তখনই বাধলো বড় বিপত্তি!
আসনটির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকা প্রভাবশালী রাজনীতিবীদ মোহাম্মদ আলী নির্বাচন করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা দেয়ার পরই গিয়াস-শাহ-আলমের করা সেই সরল অংকগুলোই বেশ গড়ল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আসনটির জন্য যোগ্য ও অবস্থান সম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে যোজন যোজন এগিয়ে থাকছেন মোহাম্মদ আলী। দানবীর হিসেবে তার যেমন জনপ্রিয়তা রয়েছে, তেমনই রয়েছে নিজস্ব ভোট ব্যাংকও। এই অঞ্চলের মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি পাশে ছিলেন। আওয়ামী লীগের শাসনামলেও তিনি ফতুল্লার বিএনপি নেতাকর্মীদের বৃহৎ একটি অংশকে সুরক্ষিত রাখতে নীরবে ছায়া তলে রেখেছেন। তাই সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপির বৃহৎ একটি অংশ রয়েছে মোহাম্মদ আলীর পাশে।
এছাড়াও দল-মত নির্বিশেষে ফতুল্লাবাসীর অঘোষিত অভিভাবক হিসেবেও ধরা হয় মোহাম্মদ আলীকে। সেক্ষেত্রে জোটের কারণে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন না পেলেও তিনি যদি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তা হলে এই আসনে বিজয়ের পাল্লা ঝুঁকবে মোহাম্মদ আলীর দিকেই।
বোদ্ধা মহল বলছেন, মনোনয়ন না পাওয়ার শঙ্কা থেকে যখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার অংক কষছিলেন গিয়াস ও শাহ-আলম; তখনই তাদের নির্বাচনী কফিনে যেন শেষ পেরেক ঠুকে দিলেন মোহাম্মদ আলী নিজেই।
উল্লেখ্য, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম সংগঠন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চেয়ে সরব হলেও তার তৎকালিন রাজনৈতিক দলীয় সহযোদ্ধা শামীম ওসমানের কাছে মনোনয়ন যুদ্ধে পরাজিত হন। তখন এমপি হওয়ার বাসনায় বিভোর গিয়াস উদ্দিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ান।
পরে কিং মেকার খ্যাত এই মোহাম্মদ আলীর হাত ধরেই বিএনপিতে প্রবেশ করে গিয়াস উদ্দিন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ধানের শীষের মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে রাতারাতি এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে বিএনপিতে এলেও তিনি মাইনাস ফর্মুলার রাজনীতির পথ বেছে নেন। বিএনপিতে যারা তাকে মেনে নিতে পারেননি, তাদের অনেকের ভাগ্যে নেমে এসেছিল বঞ্চনা ও নির্যাতনের খরগ। তার চারিদিকে বেষ্টনী দিয়ে রাখা কতিপয় রাজনৈতিক ক্যাডার এবং নিজস্ব পিএস-এপিএস দ্বারা ফতুল্লাকে শাসন করেছেন। ওই সময়ে সন্ত্রাসবাদ যেমন মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল, তেমনই উন্নয়নের দেখাও পাননি ফতুল্লার মানুষ। গুরুত্বপূর্ন সড়কগুলো ছিলো কর্দমাক্ত। এমনকি ডিএনডি এলাকায় বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করার মত অভিযোগও ছিলো সকলের মুখে মুখে।
বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনীতি থেকে অনেকটাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন গিয়াস উদ্দিন। বিএনপি থেকে এমপি হলেও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের শাসনামলে তাঁকে বিএনপির হয়ে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন রাজনীতির মাঠের এক হারিয়ে যাওয়া নাম। তবে ২০২২ সালের দিকে তিনি জেলা বিএনপির আহবায়ক হওয়ার মাধ্যমে আবারও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হলেও পূর্বের ন্যায় মাইনাস ফর্মূলায় হাঁটতে শুরু করেন। ফতুল্লায় যারা তাকে ‘জি হুজুর’ সম্বোধন করে চলেনি, তারা দলের পোড় খাওয়া নেতাকর্মী হলেও তাদেরকে নানা ভাবে কোণঠাসা করতেই সচেষ্ট ছিলেন এবং এখনো একই ধারা বজায় রেখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে স্থানীয় বিএনপির সর্ববৃহৎ ও সক্রিয় অংশটি তার পাশে নেই। ফলে এই অঞ্চলে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও গ্রহণযোগ্যতাও বেশ ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী শিল্পপতি শাহ-আলম বিএনপির দুঃসময়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিলেন বলে রাজনীতির মাঠে গুঞ্জন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দলীয় নেতা-কর্মীদের অনেকটা ‘অগ্নিকুণ্ডের’ সামনে রেখে তিনি নিজে কাটিয়েছেন আয়েশী জীবন। তবে, সু-সময়ের হাতছানি পেতেই যেন তিনি খোলস মুক্ত হয়েছেন; রাজনীতির ময়দানে উঁকি দিচ্ছেন কাছিমের ন্যায়। এমন সুবিধাবাদী চরিত্রের দরুণ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তাকে ‘দুধের মাছি’ বলে আখ্যায়িত করছেন। যিনি ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়ন পেলেও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামেননি।
উপরন্ত রয়েছে আঁতাতের গুঞ্জনও। রাজনীতির ময়দানে আনকোড়া হিসেবে পরিচিত এই শিল্পপতি ২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে শামীম ওসমানকে কেবল মাঠ খালি করে দিয়েই খ্যান্ত হননি বরং নেতাকর্মীদের মাঝ পথে ফেলে স্থানীয় রাজনীতি থেকেই ইস্তফা নিয়েছেন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে। পরবর্তী সময়কালে এই শিল্পপতির ছায়াও খুঁজে পাননি বিএনপি নেতাকর্মীরা। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও টু শব্দটুকু শোনা যায়নি তার মুখ থেকে।
তবে আওয়ামী লীগের পতন ও বিএনপির সামনে সুদিনের হাতছানি দেখেই আবারও ধানের শীষের মনোনয়ন বাগাতে সরব হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে এমপি হওয়ার সকল অংকই এখন বেশ জটিল হয়ে উঠেছে তার জন্য। দুর্দিনে মাঠ ছেড়ে পালানো এবং শিল্পপতি হলেও নিজ এলাকার জলাবদ্ধতার শিকার সাধারণ মানুষের পাশে না থাকায় শাহ-আলম তার অবস্থান হারিয়েছেন চারদিক থেকেই। তার উপর মোহাম্মদ আলীর মত হেভীওয়েট প্রার্থীর মত বড় বাধা তো থাকছেই। এতেই যেন খেই হারানোর উপক্রম হয়েছে শাহ-আলম শিবিরে।
ফলে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়া এবং ভোটের অংকে পিছিয়ে পড়াটাই যেন নিজদের রাজনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক হতে যাচ্ছে গিয়াস ও শাহআলমের জন্যে।








