নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তার এবং সাম্প্রতিক সংঘর্ষে আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামনে সমিতির নেতৃত্ব নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনা থাকলেও, এরই মধ্যে দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে আইনজীবী সমিতির নেতৃত্বের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন কারা?
গত ৬ অক্টোবর জেলা আইনজীবী সমিতির ভবনে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি, হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এইচ এম আনোয়ার প্রধানের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ঘটনাটি আদালতপাড়ার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ২০২৫-২৬ সালের নির্বাচনে সভাপতি সরকার হুমায়ুন কবির ও সাধারণ সম্পাদক এইচ এম আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম-সমর্থিত প্যানেল ১৭টি পদের মধ্যে ১৬টিতে জয়লাভ করে। অন্যদিকে একটি পদে জয়ী হন জামায়াত-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী। নির্বাচনের আগে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সাখাওয়াত হোসেন খানের ভূমিকাও ছিল। ফলে একসময় একই রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের মধ্যে বর্তমান দূরত্ব আইনজীবীদের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও আইনজীবীদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা কতটা সম্ভব হয়েছে, সাম্প্রতিক সংঘাত সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে বর্তমান বিরোধের পেছনে নির্বাচনই একমাত্র কারণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। পেশাগত দায়িত্ব, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব, বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতপার্থক্যও বিরোধের আলোচনায় এসেছে।
একসময় রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পরিসরে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা সাখাওয়াত হোসেন খান ও আনোয়ার প্রধানকে ঘিরে এখন আইনজীবীদের মধ্যে পৃথক অবস্থানের আলোচনা চলছে। ৬ অক্টোবরের ঘটনার পর দুই পক্ষের বক্তব্য ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিরোধকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
ঘটনার পর আনোয়ার প্রধানের পক্ষ থেকে সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়। অন্যদিকে সাখাওয়াতও ঘটনাটিকে বিব্রতকর বলে উল্লেখ করেছেন। এই বিরোধ কেবল দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়,এর প্রভাব আইনজীবী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক সমীকরণেও পড়তে পারে।
আইনজীবী সমিতি মূলত সদস্যদের পেশাগত অধিকার রক্ষা, কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আদালতকেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার প্রতিষ্ঠান। সেখানে নেতৃত্বের বিরোধ প্রকাশ্যে সংঘর্ষে রূপ নিলে সাধারণ সদস্যদের পেশাগত পরিবেশ ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি ব্যক্তিগত বিরোধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ কিংবা দলীয় প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তাহলে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সাধারণ আইনজীবীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং পেশাগত স্বার্থের সুরক্ষা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন হলো, নেতারা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে সমিতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারবেন কি না। বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ, দুই পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং সাধারণ আইনজীবীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বের লড়াইয়ে কার লাভ হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই বিরোধে আইনজীবী সমিতির ঐক্য, পেশাগত পরিবেশ ও সাধারণ সদস্যদের স্বার্থ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।





