কারও শরীর প্যারালাইসিসে অবশ, কারও প্রয়োজন অস্ত্রোপচার। কেউ কিডনি রোগের চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় এক বিধবা মা। কেউ এসেছেন জমিজমার বিরোধ নিয়ে, কেউ সম্পত্তি জবরদখলের অভিযোগ জানাতে।
সমস্যা ও জীবনের গল্প আলাদা হলেও বুধবার তাঁদের গন্তব্য ছিল এক—চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের সাপ্তাহিক গণশুনানি।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে সরাসরি নিজেদের অভাব, অভিযোগ ও সংকটের কথা তুলে ধরেন জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকা থেকে আসা ২৫ জন। অনলাইনে যুক্ত হয়ে আরও দুই প্রবাসী তাঁদের সমস্যার কথা জানান।
সব মিলিয়ে ২৭ জনের কথা শোনেন জেলা প্রশাসক। প্রতিটি আবেদন ও অভিযোগ শোনার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পাশাপাশি ফলাফল সেবাপ্রত্যাশীদের জানানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনিক নানা অভিযোগের ভিড়ে কয়েকটি আবেদন ছিল চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কিংবা জীবনের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর আকুতি।
লাভলেইন-ঝাউতলা এলাকার শামসুন্নাহার দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ও শয্যাশায়ী। দীর্ঘদিন বিছানায় থাকায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসক দেখানো ও ড্রেসিংয়ের খরচ বহন করতে হয়। স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে থাকছেন তিনি। কিন্তু তাঁর চিকিৎসার ব্যয় বহন করা মেয়ের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়েছে। গণশুনানিতে তাঁর কথা শুনে আর্থিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
বায়েজিদ বোস্তামীর কুলগাঁও এলাকার ৫১ বছর বয়সী মোহাম্মদ আবদুর জব্বর দীর্ঘদিন ধরে পায়ুপথের টিউমারে ভুগছেন। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় চিকিৎসা চালালেও এখন তাঁর অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। সেই ব্যয় বহন করার সামর্থ্য পরিবারের নেই। চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে সহায়তা চাইতে আসা জব্বরকেও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
চকবাজার-বাকলিয়া এলাকার মিন্টু মিয়া কিডনি রোগে আক্রান্ত। তাঁর আবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারে চিকিৎসার খরচ বহন করার মতো আর কেউ নেই। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ৩০ হাজার টাকা। কিন্তু অর্থসংকটে সেই টাকা জোগাড় করতে পারছেন না। তাঁর পরিস্থিতি শুনেও সহায়তার ব্যবস্থা করেন জেলা প্রশাসক।
খুলশীর ওয়ালের্স কলোনীর আক্তার হোসেন পাঁচ বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ ও ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন হলেও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ব্যয় বহন করা তাঁর পরিবারের পক্ষে কঠিন। গণশুনানিতে তাঁর আবেদন বিবেচনায় নিয়েও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, মুরাদপুরের রোসনা খাতুন এসেছিলেন মেয়ের বিয়ের জন্য সহায়তা চাইতে। সাপুড়িয়া সম্প্রদায়ের এই বিধবা নারীর তিন মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ে ঠিক হলেও অর্থের অভাবে খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। তাঁর দুর্দশার কথা শুনে মেয়ের বিয়ের জন্য আর্থিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এদিন মোট ছয়জন অসুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
গণশুনানিতে জমিজমার বিরোধ ও সম্পত্তি জবরদখলসহ বিভিন্ন অভিযোগও আসে। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক।
প্রতি বুধবার চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সেখানে সরাসরি তাঁদের সমস্যা ও অভিযোগ জানাতে পারেন। প্রবাসীদের জন্য রয়েছে অনলাইনে অংশ নেওয়ার সুযোগ।
বুধবার সেই টেবিলে তাই একসঙ্গে জায়গা পেয়েছে জমির বিরোধ, প্রবাসীর সমস্যা, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার আকুতি এবং মেয়ের বিয়ে দিতে না পারা এক বিধবা মায়ের দুশ্চিন্তা। একেকটি আবেদন ছিল একেকটি জীবনের সংকটের গল্প—যা শুনে প্রশাসনিক নির্দেশনার পাশাপাশি জরুরি ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সহায়তাও দিয়েছেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম।
এস এম জহিরুল ইসলাম বিদ্যুৎ :







