নারায়ণগঞ্জ ।
,

নির্দিষ্ট সময়ের আগেই কলেরা টিকা পেয়ে খুশি জনসাধারণ

প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় উচ্চঝুঁকি পূর্ণ এলাকার ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে দুই দফায় মুখে খাওয়ার কলেরা প্রতিরোধক টিকা দেওয়া হচ্ছে। পানিবাহিত রোগ কলেরা প্রতিরোধে গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বা তার চেয়ে বেশি বয়সের সব নাগরিককে বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে ইউরিকল প্লাস নামের টিকা।

আইসিডিডিআর,বি; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ সহযোগিতায় ২২ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে প্রথম ধাপের টিকাদান কর্মসূচি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম ডোজের এবং ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়া হবে।

কর্মসূচির আওতায় সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ ১৪টি উপজেলা ও থানায় টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে কলেরার টিকা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগরেও এ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

২০ আগস্ট টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সেখানে তিনি বলেন, কলেরা টিকা খাওয়ানোর এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

চারবছর বয়সি শিশু নওরিন আক্তার জুঁইকে কলেরা প্রতিরোধক টিকা খাওয়াতে রাজধানীর লালবাগ দোতলা মসজিদ এলাকা থেকে আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে নিয়ে এসেছেন মা ফাতেমা আক্তার। আলাপকালে তিনি বলেন, মাঝে মাঝে মেয়েটার পেটের সমস্যা হতো। সবাই বলতো হাত ধুয়ে খাবার খাওয়াতে। ভালো পানি দিয়ে খাবার রান্না করতে এবং পানি ফুটিয়ে মেয়েকে খাওয়াতে। আসলে এ সবই করতাম, কিন্তু লাভ তেমন একটা হতো না। পেটের সমস্যা লেগেই থাকতো। সরকার বিনা মূল্যে কলেরা টিকা খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে এ জন্য তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে দুই বছরের ছেলে অর্ণব সরকারকে কলেরা টিকা খাইয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন শিশুটির মা পলি সরকার। তিনি বলেন, ছেলেটার সারা বছর শরীর খারাপ থাকে। সঙ্গে পেটের সমস্যা তো আছেই। ছেলেকে কলেরা টিকার প্রথম ডোজ খাওয়ানো হয়েছে। আগামী মাসের ২৬ তারিখ দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াবো। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এমন উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট টিকাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সকল বয়সি মানুষকে যত্নসহকারে কলেরা টিকা খাইয়ে দিচ্ছেন তাহমিনা আক্তার।

তিনি বলেন, আমরা সকাল থেকে টিকা কার্যক্রম শুরু করেছি। এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসছেন, নাম এন্ট্রি করে টিকা খেয়ে যাচ্ছেন। এক মাস পরে আবার সবাইকে এসে দ্বিতীয় ডোজ খেয়ে যেতে বলা হচ্ছে এবং টিকা কার্ডে লিখে দিচ্ছি।

সরেজমিনে বিভিন্ন টিকাকেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, টিকাদানের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের একজন নাম নথিভুক্ত করছেন। একজন অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করছেন এবং অপর একজন রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে টিকা খাইয়ে দিচ্ছেন। আর বাকি কর্মীরা অস্থায়ী কেন্দ্রের আশ-পাশের মানুষের কাছে গিয়ে প্রচার-পত্র দিচ্ছেন এবং কলেরা টিকা খেতে বলছেন। টিকা খেলে কি কি সুবিধা হবে তা বোঝানোর চেষ্টা করছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আওতাভুক্ত তেজগাঁও এলাকার ২৪ নং ওয়ার্ডের টিকা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আজিজুর রহমান নামের এক ব্যক্তি তার দুই সন্তানকে কলেরা টিকা খাওয়াতে নিয়ে এসেছেন। একজনের বয়স ৭ বছর, অপরজনের সাড়ে ৩ বছর।

টিকা খাওয়ানো শেষ করে আজিজুর রহমান বলেন, কিছুদিন থেকে ডেঙ্গু ও হাম নিয়ে খুব ভয়ে আছি। এর মধ্যে যদি আবার ডায়রিয়া শুরু হয় তাহলে তো সমস্যা। দুই ছেলেকে কলেরা টিকার প্রথম ডোজ খাওয়াতে পেরে ভালো লাগছে। ভয় অনেকটাই কেটে গেছে। আগামী মাসের ২৬ তারিখে আবার দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াতে হবে।

অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, বর্তমানে প্রথম ধাপে ১৪টি উপজেলায় টিকাদান চলছে। পরে ধাপে ধাপে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলায় এই টিকা দেওয়ার কথা রয়েছে। দুই ধাপে দেওয়া এই টিকা কার্যকর থাকবে তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন। মারা যায় প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ। এখনও বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন, যার অধিকাংশই আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়া কেন্দ্রিক।

আইসিডিডিআর,বি এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিবদ্ধ কলেরা রোগীর মোট সংখ্যা ছিল ছয় হাজার ১৪১ জন। এতে দেখা গেছে, ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সর্বোচ্চ আক্রান্ত হয়। পরে তা কমে এলেও ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা আবারও বাড়তে থাকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >