নারায়ণগঞ্জ । শুক্রবার
৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে পিআইবিতে আলোচনা সভা

শহীদ রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) এক আলোচনা সভা ও বিশেষ সংবাদপত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর পিআইবি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে রাজনীতি, কূটনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম ও শিক্ষাঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠান উপলক্ষে পিআইবির উদ্যোগে ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন, শিরোনাম ও ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে একটি বিশেষ সংবাদপত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের জন্য জিয়াউর রহমানের জীবন, কর্ম ও রাজনৈতিক দর্শন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিভিন্ন প্রকাশনা নিয়ে একটি বই ও প্রকাশনা স্টলও স্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিত্বে এবং পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ এর অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুশতাক খান।

‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের স্বাধীন নির্জোট কূটনীতি’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মনিরুজ্জামান। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নালের সম্পাদক আবু রূশদ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক ড. সফিকুর রহমান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়ের বোধ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো তিনি এ দেশের মানুষকে একটি স্বকীয় পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে জনগণকে বুঝিয়েছিলেন যে, আমরা একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জাতি, যার নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বিএনপি উদার গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী একটি রাজনৈতিক দল এবং জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্নে জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর দেশের মানুষ স্বাধীনতার অর্জন ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মির্জা ফখরুল বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ সবসময় দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সোচ্চার থেকেছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও জনগণ সেই চেতনারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে।” তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাষ্ট্রচিন্তার মধ্যেও জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতিফলন দেখতে পান বলে উল্লেখ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ১৯৭৫ সালের পর দেশের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন জিয়াউর রহমান। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছিলেন।

তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোকে বহুপাক্ষিক ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা বিশ্ব, মুসলিম দেশসমূহ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার নীতি অনুসরণ করেন।”

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মনিরুজ্জামান বলেন, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ এবং কৌশলগত স্বাধীনতা রক্ষা করা। তিনি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা দেশ, মুসলিম বিশ্ব ও আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বিত সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীন ও স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। পাশাপাশি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে তিনি পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. মুশতাক খান বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণার মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মতে, এই দর্শন দেশের মানুষের মধ্যে আত্মপরিচয় ও রাষ্ট্রচিন্তার নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

আলোচক আবু রূশদ বলেন, একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর কূটনীতি সম্ভব নয়। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা কাঠামোকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছিলেন।

অপর আলোচক ড. সফিকুর রহমান বলেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক গণতন্ত্র ও সহযোগিতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, জিয়াউর রহমান ছিলেন দেশের ইতিহাসে একমাত্র মুক্তিযোদ্ধা শাসক। তাই তাঁকে কেবল সামরিক শাসক হিসেবে আখ্যায়িত করা ইতিহাসের একটি বিকৃত ব্যাখ্যা বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা সংবাদপত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন এবং জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনা, কূটনৈতিক দর্শন ও বাংলাদেশের উন্নয়নে তাঁর অবদান নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। পিআইবির এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরা হয়েছে বলে আয়োজকরা মনে করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >