নারায়ণগঞ্জ । বৃহস্পতিবার
১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তোলারাম কলেজের নবীন বরণে দিনভর উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সরগরম ক্যাম্পাস

নারায়ণগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি তোলারাম কলেজে নবীন বরণ উৎসবকে ঘিরে যেন এক অঘোষিত রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হলো পুরো ক্যাম্পাস। বর্ণাঢ্য আয়োজনের আড়ালে দিনভর চলে ছাত্র সংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা।

শুক্রবার (৮ মে) সকাল থেকে কলেজ প্রাঙ্গণে শুরু হয় নবীন বরণ উৎসব। সাংস্কৃতিক আয়োজন, অতিথিদের বক্তব্য ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হলেও শুরু থেকেই বিরাজ করছিল চাপা উত্তেজনা। আর সময় যত গড়িয়েছে, ততই প্রকাশ্যে এসেছে ছাত্র সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম এবং প্রধান বক্তা ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শহিদুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ভিপি মাশুকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা, নবীন বরণ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি, মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব শাহেদ আহমেদ এবং নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আহমেদুর রহমান তনুসহ আরও অনেকে।

তবে অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকেই ক্যাম্পাসে শুরু হয় উত্তেজনা। অভিযোগ ওঠে, নবীন বরণকে কেন্দ্র করে কলেজ প্রশাসন ও একটি পক্ষ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত অতিথি তালিকা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিএনপির সংসদ সদস্য ও নেতাদের অধিক উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন।

জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ইসলামী ছাত্র শিবির, এনসিপি’র জাতীয় ছাত্রশক্তি, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র মজলিসের নেতারা প্রকাশ্যে এ আয়োজনের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি ছিল—জুমার দিনে এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন অনুচিত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করা হচ্ছে।

এ নিয়ে বৃহস্পতিবার থেকেই কলেজ ক্যাম্পাসে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, কলেজ প্রশাসনকে জরুরি বৈঠকে বসতে হয়। পরে অধ্যক্ষ প্রফেসর শহিদুল ইসলাম শিক্ষকদের নিয়ে উভয়পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু উত্তেজনা থামেনি অনুষ্ঠানদিনেও।

শুক্রবার বেলা এগারোটার দিকে জাতীয় ছাত্রশক্তি, ছাত্র শিবির, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র মজলিস যৌথভাবে সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ নিলে তাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে ছাত্রদলের নেতাদের বিরুদ্ধে। এতে মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কলেজ প্রাঙ্গণ। একপর্যায়ে উভয়পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যেও।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক দফা বাকবিতণ্ডার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। যদিও উপস্থিত শিক্ষক ও অতিথিরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল উত্তেজনা আর উদ্বেগের আবহ।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এ নবীন বরণকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে স্ট্যাটাস দিলে অনলাইনেও সৃষ্টি হয় তর্ক-বিতর্কের ঝড়। কেউ একে “রাজনৈতিক দখলদারিত্বের বহিঃপ্রকাশ” বলছেন, আবার কেউ বলছেন “গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক চিত্র”।

তবে সব বিতর্ক, উত্তেজনা ও সংঘাতের মাঝেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে শেষ পর্যন্ত নবীন বরণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নবীনবরণ কি শিক্ষার্থীদের উৎসব, নাকি রাজনৈতিক বলয়ের ক্ষমতা প্রদর্শনের নতুন মঞ্চ?

সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও সংবাদ >