তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের উপরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে চলেছে চিন। প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন মেডোগ প্রকল্প নিয়ে ভারত শুরু থেকেই কৌশলগত ও পরিবেশগত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এবার এই প্রকল্প নিয়ে ভারতের কৌশল এবং চিনা বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার কথা বললেন বিশিষ্ট কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি।
ব্রহ্মা চেলানি তার একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, ভারত যদি চিনের সীমান্তের ঠিক উপরে এমন বিশাল প্রকল্প তৈরি করত, তাহলে বেইজিং পরিবেশ, ভূমিকম্পের ঝুঁকি এবং বৈজ্ঞানিক উদ্বেগ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক স্তরে কত বড় প্রচার চালাত, আন্দাজ করুন তো একবার? তার মতে, চিনের বিজ্ঞানীরা যে উদ্বেগের কথা সামনে এনেছেন, ভারতকেও তা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা উচিত।
ব্রহ্মপুত্রের উপর তৈরি হচ্ছে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের প্রকল্প: বস্তুত, তিব্বতের মেডোগ কাউন্টিতে ইয়ারলুং সাংপো নদীর উপর এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করছে চিন। এই নদীই ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করার পর সিয়াং এবং পরে ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়।
প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ক্ষমতা প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বলে জানা গিয়েছে। এই ক্ষমতা চিনের থ্রি গর্জেস ড্যামের থেকেও অনেক বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রকল্পটি এমন একটি এলাকায় অবস্থিত, যেখানে ইয়ারলুং সাংপো নদী নামচা বারওয়া পর্বতের কাছে বিশাল একটি বাঁক নিয়ে ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, চিন ২০২৫ সালে এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করে। প্রকল্পটির বিশাল আকার এবং ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান একে শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ রাখেনি; নদীর জলপ্রবাহ, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সঙ্গেও এটি জড়িয়ে পড়েছে।
যে জমির নীচে ড্যাম তৈরি হচ্ছে, তার নীচে কী রয়েছে?
ব্রহ্মা চেলানি তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, মেডোগ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে একটি চিনা ভূতাত্ত্বিক গবেষণার পর। ওই গবেষণায় প্রকল্প এলাকার নীচে একটি সক্রিয় পাইঝেন ফল্ট অর্থাৎ পৃথিবীর ভূত্বকের একটি সক্রিয় ফাটল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চিনের সরকারি ভূতাত্ত্বিক জরিপের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাটি করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, ওই এলাকার শিলাস্তরে ফাটল রয়েছে এবং সেগুলির গঠন তুলনামূলকভাবে দুর্বল। গবেষকরা আরও সতর্ক করেছেন যে ভূমিকম্পজনিত কার্যকলাপ এবং ফল্টের নড়াচড়ার কারণে জলাধারের আশপাশে ভূমিধস ও শিলাখণ্ড সরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রিপোর্টে ২০১৭ সালে তিব্বতের নিংচি এলাকায় হওয়া ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্পের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ওই ভূমিকম্প একই ফল্ট সিস্টেমের সক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে এই বৈজ্ঞানিক সতর্কতার অর্থ এই নয় যে ড্যামটি নিশ্চিতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অথবা ভবিষ্যতে এটি ভেঙে পড়বেই। গবেষণাগুলি মূলত ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
ভারতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ জলপ্রবাহ নিয়ে
মেডোগ প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগ শুধু ড্যামের নিরাপত্তা নিয়েই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন রয়েছে, ব্রহ্মপুত্রের উজানে নদীর জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ফলে চিনের হাতে কতটা ক্ষমতা চলে আসবে।
চিন এই প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর জলপ্রবাহের উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে বর্ষার সময় জলপ্রবাহের পরিবর্তন, হঠাৎ জল ছেড়ে দেওয়া বা জল ধরে রাখার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ব্রহ্মপুত্র ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। এর জলপ্রবাহের পরিবর্তন বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে চিনের এই মেগা প্রকল্পকে ভারত শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প হিসেবে দেখছে না এর সঙ্গে জলনিরাপত্তা, পরিবেশ এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কৌশলগত স্বার্থও জড়িত রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রহ্মা চেলানির বক্তব্য হল, চিনা বিজ্ঞানীদের প্রকাশ করা ভূতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত উদ্বেগগুলি ভারতের আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে ভারতের উচিত প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা এবং ব্রহ্মপুত্রের জলপ্রবাহ ও পরিবেশের উপর এখন থেকেই নজরদারি আরও বাড়ানো।



