সন্তান হারিয়ে মায়ের বুকফাটা আহাজারি ‘আর কত মায়ের বুক খালি হলে টনক নড়বে?’ছেলেটার বয়স মাত্র ১৩ বছর। নাম অপ্রতিম। বয়সের তুলনায় পৃথিবীকে জানার, বোঝার ও স্বপ্ন দেখার সময় ছিল তার সামনে। কিন্তু একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সেই স্বপ্নগুলোই থেমে গেল চিরতরে।
অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম। মায়ের আইফোনটি সঙ্গে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল অপ্রতিম। মা জানতেনই না, ছেলে তার ফোনটি নিয়ে বাইরে বেরিয়েছে।
কিন্তু সন্তান যখন নির্ধারিত সময়ে বাসায় ফিরল না, তখন একজন মায়ের মনে কী ধরনের দুশ্চিন্তা আর ভয়াবহ আশঙ্কা তৈরি হতে পারে তা কেবল একজন মা-ই অনুভব করতে পারেন। গতকাল থেকেই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় মায়ের আকুতি, আহাজারি আর উৎকণ্ঠার দৃশ্য ছিল হৃদয়বিদারক। তার একটাই চাওয়া ছিল সন্তান যেন জীবিত অবস্থায় ফিরে আসে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপ্রতিম আর ফিরল না।
১৩ বছরের একটি শিশুকে আমরা নিরাপদ রাখতে পারলাম না। একটি মোবাইল ফোনের জন্য একজন নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া হলো যদি ঘটনাটি তদন্তে এমনটাই প্রমাণিত হয়, তাহলে এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে?
একটি আইফোনের মূল্য টাকা দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব। হারিয়ে গেলে নতুন একটি ফোন কেনা যায়। কিন্তু একজন সন্তানকে হারানোর পর সেই শূন্যতা কি কোনোদিন পূরণ করা সম্ভব?
আজ অপ্রতিমের পরিবার শুধু একটি শিশুকে হারায়নি; একজন মা হারিয়েছেন তার পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে। যে মা গতকালও সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য মানুষের কাছে আকুতি জানিয়েছেন, আজ সেই মায়ের কোলই শূন্য।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো অপ্রতিমের মা এর আগেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। রামিসার হত্যার বিচার চেয়েছিলেন তিনি। একটি সন্তানের হত্যার বিচার চেয়েছিলেন একজন মা। অথচ আজ সেই মায়ের নিজের সন্তানই নেই।
একজন মায়ের কান্না যখন আরেকজন মায়ের কান্নার সঙ্গে মিশে যায়, তখন প্রশ্নটা শুধু একটি পরিবারের থাকে না—প্রশ্নটা পুরো সমাজের, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই না, যেখানে একটি মোবাইল ফোন, সামান্য অর্থ কিংবা কোনো বস্তুগত সম্পদের জন্য একটি শিশুর জীবন ঝরে যাবে। আমরা এমন একটি নিরাপদ সমাজ চাই, যেখানে ১৩ বছরের একটি শিশু বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরতে পারবে।
অপ্রতিমের চলে যাওয়া আমাদের সামনে আবারও কঠিন কিছু প্রশ্ন রেখে গেল—আমাদের সন্তানরা কতটা নিরাপদ? অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা কতটা কার্যকর? আর কতটি পরিবার সন্তান হারালে আমরা বুঝব, নিরাপত্তার জায়গায় কোথাও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে?
অপ্রতিম আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
একটি আইফোন আবার কেনা যায়।
একটি ঘর আবার তৈরি করা যায়।
হারানো অর্থও একদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব।
কিন্তু একজন মায়ের হারানো সন্তান কখনোই ফিরে আসে না।
আর কত মায়ের বুক খালি হলে আমাদের টনক নড়বে?





