কুড়িগ্রামে কাগজে-কলমে সারের কোনো সংকট নেই। বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলনও সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দও পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে নতুন বরাদ্দের সার উত্তোলন শুরু হয়েছে। কিন্তু মাঠের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। প্রয়োজনের সময় চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দ ও উত্তোলনের হিসাব ঠিক থাকলেও সেই সার নিয়মিতভাবে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সার মিললেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষকদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে সারের জন্য। সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও কারসাজির কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, শুধু বরাদ্দ ও উত্তোলনের হিসাব দেখলেই হবে না; সেই সার শেষ পর্যন্ত কোথায় গেল এবং কতটুকু সার প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছেছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে নিয়মিত তদারকি, মজুতের হিসাব যাচাই এবং নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি হিসাবে যদি পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ থাকে এবং সেই সার উত্তোলনও সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে বাজারে সংকট কেন? বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে তা কৃষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে- এ বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি তাদের।
একই সঙ্গে সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দ দ্রুত মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করার দাবি ওঠেছে। কৃষকদের মতে, সার বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে।
কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো সার না পেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তে পারে কৃষকের উৎপাদন খরচ। তাই প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ডিলার পর্যায়ে সার সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি না থাকায় অনেক সময় প্রকৃত কৃষকের কাছে চাহিদা অনুযায়ী সার পৌঁছায় না। ফলে একদিকে সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত মজুতের তথ্য থাকলেও অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
কৃষক সেকেন্দার আলী বলেন, কাগজে-কলমে সার থাকলেই হবে না, সেই সার প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছাতে হবে। বরাদ্দ, উত্তোলন ও বিতরণের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে কুড়িগ্রামে সারের চলমান সংকট দ্রুতই কেটে যাবে।
সারের সংকট নিয়ে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে ডিলারদের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সংকট থাকবে না।
ডিলারদের ভাষ্য, বরাদ্দ অনুযায়ী সার উত্তোলন করা হলেও সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে সময় লাগায় বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে নতুন বরাদ্দের সার বাজারে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তারা আশা করছেন।
রাজারহাট উপজেলার বিসিআইসি ডিলার মেসার্স সুরমা ট্রেডার্সের ম্যানেজার সাগর কুমার জানান, আগে কৃষকরা খুচরা দোকানদারের কাছ থেকে সার কিনত, ডিলাররা খুচরা সার দোকানদারের কাছে বিক্রি করতে পারতেন। তবে এখন সেই নীতিমালা না থাকায় কৃষকরা সরাসরি আমাদের কাছ থেকে সার কিনতে পারছেন। সারের কোনো সংকট নেই।
কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত আগস্ট মাসে কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ইউরিয়া সার বরাদ্দ ছিল ৬০০ মেট্রিক টন। এছাড়া টিএসপি ৭০ মেট্রিক টন, ডিএপি ৩০৭ মেট্রিক টন এবং এমওপি ১৯৫ মেট্রিক টন বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ অনুযায়ী এসব সার উত্তোলনও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি অফিস।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সেপ্টেম্বর মাসের ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সারের বরাদ্দও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। এসব সার উত্তোলন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ফলে সরকারি হিসাব অনুযায়ী জেলায় সারের ঘাটতি থাকার কথা নয়। কিন্তু কৃষকেরা বলছেন, বাস্তবে প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যাচ্ছে না।
বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কৃষকদের কাছে সারের সংকট শুধু বাজারের একটি সাধারণ সমস্যা নয়, এটি সরাসরি ফসল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত।
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় বলেন, ‘চাহিদার বিপরীতে রাজারহাটে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। সারের কোনো সংকট নেই। এরপরও কৃষকেরা কেন সার পাচ্ছেন না, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’




