নারায়ণগঞ্জ ।
,

দুই বছরেও শনাক্ত হয়নি অস্ত্রধারীরা

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সর্বাত্মক অসহযোগের দিন রংপুরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। তখন সেখানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অন্তত ১০ জন সশস্ত্র নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ও বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে তাদের অস্ত্র হাতে দেখা গেলেও, ঘটনার দুই বছরেও তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এদিকে ঘটনার পর পরিচালিত অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে ওই ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোও উদ্ধার হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা জানায়, ৩ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে নগরীর টাউন হল এলাকায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ব্যাপক সমাগম হয়। সেদিন টাউন হল থেকে বের হওয়া একটি মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। ওই দিন পুলিশ সদস্যরা বলপ্রয়োগ না করে তাদের কাছ থেকে ফুল গ্রহণ করেন।

আন্দোলনকারীরা জানায়, আন্দোলনে ছাত্র-জনতার এমন স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেয় মহানগর পুলিশ। এতে আওয়ামী লীগ চাপে পড়ে আন্দোলনকারীদের রাজপথ থেকে সরিয়ে দিতে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে হামলার পরিকল্পনা করে। রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নগরীতে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেওয়া, অস্ত্র সরবরাহ এবং হামলায় অংশ নেওয়ার দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তারা।

একাধিক আন্দোলনকারী ও প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, ৪ আগস্ট সকাল থেকেই সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিতে টাউন হল এলাকায় ছাত্র-জনতার ঢল নামে। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সমাবেশ টাউন হল এলাকা ছাড়িয়ে আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়ে। তারা সড়ক অবরোধ করে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করতে থাকেন। একই সময়ে নগরীর দেওয়ানবাড়ী এলাকায় জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। তারা পায়রা চত্বর, জাহাজ কোম্পানি মোড় ও সুপার মার্কেট এলাকায় সশস্ত্র অবস্থান নেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা এসব জায়গায় অবস্থান নিয়ে দুই দিক থেকে আন্দোলনকারীদের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে জানা যায়,দুপুর ১২টার দিকে নগরীর সুপার মার্কেট এলাকার দিক থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা ছাত্র-জনতার সমাবেশের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। তাদের কয়েকজন জেলা পরিষদ কমিউনিটি সেন্টার মার্কেটের সামনে পৌঁছানোর পর বিক্ষোভস্থলে অগ্রসর হতে হতে গুলি ছুড়তে শুরু করেন। এতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা পিছু হটেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাদের পালটা ধাওয়ায় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা পালিয়ে যান। পরে আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

এদিকে ঘটনার দিন আওয়ামী অস্ত্রধারীদের গুলি চালানোর একটি ভিডিও ফুটেজ এসেছে কালবেলার হাতে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, হেলমেট পরা দুজন অস্ত্রধারী পিস্তল হাতে আন্দোলকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এসময় তাদের সঙ্গে থাকা অন্যদের হাতেও ছিল দেশীয় অস্ত্র। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, সেদিন অন্তত ১০ জন অস্ত্রধারী গুলি চালিয়েছে।

এদিকে সেদিন ঘটনার পর পরই রংপুর ছেড়ে পালিয়ে যান আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মী। বাকিরা পরদিন হাসিনার পতনের পর এলাকা ছাড়েন। ঘটনার দুই বছরেও অস্ত্রধারীরা এখন পর্যন্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে।

যুবলীগের দুজন নেতা এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের দাবি, ৩ আগস্ট রাতে ছাত্রদের আন্দোলন মোকাবিলায় একটি পরিকল্পনা করা হয়। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নগরীতে আসতে বলা হয়।

তারা জানান, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংরক্ষিত নারী আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য নাসিমা জামান ববি, জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রনি, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী তুহিন এবং রংপুর সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর তৌহিদুল ইসলাম সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া কয়েকজন নেতা অস্ত্র সরবরাহ করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করেন বলে দাবি করেন তারা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর জেলা কটির সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘অস্ত্রধারীরা চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার না হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। জুলাই আন্দোলনের মামলাগুলো নিয়ে পুলিশের আগ্রহ নেই। এখন পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আওয়ামী লীগের যেসব সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে গুলি চালিয়েছে তাদের চিহ্নিত করতে না পারার পেছনে কী কারণ আছে, সেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই জবাবদিহি করতে হবে।’

মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন কালবেলাকে বলেন, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দুই বছরেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শনাক্ত করতে পারেনি, এটি দুঃখজনক ঘটনা। এ ঘটনায় পুলিশ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গাফিলতির প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সেদিনের ‘অস্ত্রধারীদের’ শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানান।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী কালবেলাকে বলেন, ঘটনার পর অভিযুক্ত অস্ত্রধারীরা আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছেড়েও পালিয়েছেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম চলছে। ছাত্রজনতার ওপর যারা গুলি চালিয়েছে তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >