নারায়ণগঞ্জ ।
,

ঢাকায় ৩২ বাস রুটের প্রাথমিক অনুমোদন

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে নতুন গতি এসেছে। প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৩২টি বাস রুটের বিন্যাস (এলাইনমেন্ট) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব রুটকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার জন্য সমন্বিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈঠকে প্রথম ধাপে কোনো দুই বা তিনটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

ডিটিসিএর জারি করা ‘সভার নোটিশ’ অনুযায়ী, আজ দুপুর ১২টায় ডিটিসিএ ভবনে ‘ঢাকা মহানগরীর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান’ বিষয়ক এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন।

রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ে জানা গেছে, নতুন রুটগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে একই করিডোরে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমে আসে এবং যাত্রীরা নির্ধারিত রুটভিত্তিক সেবা পান। এর মাধ্যমে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি রুটের মধ্যে রয়েছে নন্দন পার্ক–ডেমরা, নন্দন পার্ক–কাঁচপুর, দিয়াবাড়ী–সদরঘাট, শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির, কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ, গাবতলী–শিমুলতলী, ঘাটারচর–সালনা, নবীনগর–বাবুবাজার, সাভার–কাঁচপুর, গাবতলী–ডেমরা, গাবতলী–কুড়াতলী, কাঁচপুর–গাজীপুর, সাভার–আড়াইহাজার ইত্যাদি।

এসব রুটের মাধ্যমে বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কাঁচপুর, সদরঘাট, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জসহ রাজধানীর প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ৩২টি রুট নির্ধারণ করেছি এবং এটি নিয়ে মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রথম পর্যায়ে দুই বা তিনটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো রুট কর্তৃপক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘মালিক ও শ্রমিকরা যে রুটগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও বাস্তবায়নযোগ্য মনে করবেন, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাবে। বৈঠকেই প্রথম ধাপের রুট চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি বাস রুট এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো খসড়া বা প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এরপর ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি, কোন ধরনের বাস চলবে এবং কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে; সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘রুট চূড়ান্ত করার আগে প্রতিটি করিডোরে যাত্রীর চাপ, সড়কের প্রশস্ততা ও পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় সমীক্ষা করা হবে। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতে কোন রুটে কী ধরনের বাস প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে।’ তার মতে, ঢাকা-গাজীপুর বা ঢাকা-সাভারের মতো ব্যস্ত করিডোরে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক বাস পরিচালনা শুরু করা যেতে পারে।

সাইফুল আলম বলেন, ‘বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্দেশ্য শুধু নতুন রুট নির্ধারণ নয়; বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। এজন্য ডিজিটাল ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, প্রতিটি স্টপেজে বাসের আগমনের সময় জানাতে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড এবং যাত্রী ও চালকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মালিক ও শ্রমিকদের সম্পৃক্ত রেখেই ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে বেসরকারি মালিকরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার জন্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র কালবেলাকে জানায়, বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে সরকারের সঙ্গে মালিকদের কোনো মতপার্থক্য নেই। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে তারাও আগ্রহী। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০০টি বাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আংশিক ডাউন পেমেন্টের ভিত্তিতে বাসগুলো সরবরাহের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাসের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামোও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন অনেক আগেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল। স্মার্ট সিগন্যাল বা ইলেকট্রিক বাসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থা, যা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একই করিডোরে একাধিক বাসের প্রতিযোগিতার কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা চালু হলে বাসের নেটওয়ার্ক আরও কার্যকর হবে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবে, যানজট কমবে এবং মেট্রোরেলের ওপর চাপও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।’

ড. শামসুল হক বলেন, ‘এই সংস্কারের জন্য সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। সরকার সফল হলে রাজধানীর গণপরিবহনে দীর্ঘদিনের অরাজকতা দূর করে একটি আধুনিক, যাত্রীবান্ধব ও টেকসই বাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে যেসব মালিক বাস খাতে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করা উচিত হবে না। বরং কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থায় তাদের ইক্যুইটি বা অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >