নারায়ণগঞ্জ । বুধবার
১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
২৮শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ভোলপাল্টে কাশেমীর পাশে নৌকার চেয়ারম্যান
আলীরটেকে ভোটারদের প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন ঘি জাকির

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অধিনস্থ আলীরটেক ইউনিয়নে সাধারণ ভোটারদের হুমকি ও চাপের মুখে রাখার অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়নটির নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা ঘি জাকিরের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান হলেও তিনি ভোল পাল্টে বিএনপি সেজেছেন। বিশেষ স্বার্থ হাসিলের লক্ষে বিএনপির সমর্থিত জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নেমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় একাধিক হত্যা মামলা থাকা সত্বেও উল্টো তিনিই ভোটারদের মামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছেন। কাশেমীর পক্ষে কাজ না করলে হয়রানীর শিকার হতে হবে বলে প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন- এমন অভিযোগ আলীরটেকের একাধিক ভোটারের।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যেসকল চেয়ারম্যানরা বীরদর্পে ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম আলীরটেকের নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান ঘি জাকির। শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানকে মোটা অংকের অর্থ ডোনেট করে রাতারাতি নৌকা প্রতীক বাগিয়ে নিয়ে বিতর্কিত ভোটের মাধ্যমে চেয়ারম্যান বনে যাওয়া এই জাকির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে রয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলা হত্যার ঘটনায় একাধিক মামলা। সেই ওসমানীয় দোসর আওয়ামী লীগ নেতা ঘি জাকির এখন নিজের পিঠ বাঁচাতে রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেছেন। আওয়ামী লীগের মনোনীত ইউপি চেয়ারম্যান হলেও তার মুখে ফুটেছে বিএনপির বন্দনা! বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে খেজুর গাছ প্রতীকের জোটের প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর পক্ষে বক্তব্য রেখে নিজের চতুরতা ও দুর্ভিসন্ধির জানান দিচ্ছেন। এতে সর্ব মহলে তিনি হাস্যরসের পাত্রে পরিণত হয়েছেন। তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন বিএনপির প্রকৃত নেতাকর্মীরাও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আলীরটেক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সেক্রেটারিকে সহ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি সমর্থিত জোটের প্রার্থী মনির হোসেন কাশেমীকে ম্যানেজ করে নৌকার চেয়ারম্যান ঘি জাকির নিজেই বিএনপি সেজে বসেছেন। এলাকায় প্রকাশ্যে দাবরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

আলীরটেক ইউনিয়ন বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জাকির চেয়ারম্যান ওরফে ঘি জাকির হলো ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ সহচর। তার উপর তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আলীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় একাধিক মামলা রয়েছে। আন্দোলনের সময়ে তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগ সহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকে অর্থ দিয়ে সহায়তা করেছেন এবং আন্দোলন দমাতে সোচ্চার ছিলেন। তিনি ছিলেন বিএনপির ঘোর বিরোধী। সেই ব্যক্তিই এখন নির্লজ্জের ন্যায় রাতারাতি ভোল পাল্টে বিএনপির বন্দনায় মেতেছেন। কাশেমীর পক্ষে ভোট চাইছেন। এখানে তার বিশেষ স্বার্থ রয়েছে। নিজের পিঠ বাঁচাতে ও পথ সুগম করতে তিনি ভোল পাল্টেছেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো বিএনপির সমর্থিত প্রার্থী মুফতি মনির হোসেন কাসেমীর ভূমিকা তাকে বিতর্কিত করে তুলছে। একজন নৌকার চেয়ারম্যানকে তিনি তার নির্বাচনি মাঠে নামিয়ে বিএনপির প্রকৃত নেতাদের হৃদয়ে আঘাত করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতিষ্ঠিত করার মিশনে নেমেছেন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

এদিকে, আলীরটেক ও আশপাশের অঞ্চলের ইটভাটাগুলো ঘি জাকিরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও বিশেষ সূত্রে জানা গেছে। সূত্রগুলোর অভিযোগ, এসকল ইটভাভাটা থেকে ঘি জাকিরের নামে চাঁদা আদায় করছে একটি মহল।

কথিত আছে, এক সময়ে ভেজাল ঘি এর ব্যবসা করতেন জাকির হোসেন। সেই থেকে লোকে তাকে চেনেন ঘি জাকির নামেই। ভেজাল তথা অবৈধ ঘি এর ব্যবসা করে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া ঘি জাকির বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে আরও বেশি ফুলে ফেঁপে উঠেছেন। এক দিকে টাকার কুমির আর অন্যদিকে ওসমান পরিবারের সাথে বিশেষ সখ্যতা; এই দুটোকে পুঁজি করে চেয়ারম্যান হওয়ার আগে থেকেই আলীরটেকে ছড়ি ঘুড়াতেন তিনি। অতঃপর ওসমানদের হাত ধরে টাকার ভেলকিতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতিক নৌকার মনোনয়ন ও নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তিনি বনে যান আলীরটেক ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান।

বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রথমে নৌকা প্রতীক দেয়া হয় সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান মতিকে। তবে রহস্যজনক কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান মতি। তিনি নিজেকে অসুস্থ্য দাবি করেন। পরে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক বাগিয়ে নেন ঘি জাকির।

ওই সময় এলাকায় জাকির ভোটের প্রচারণায় প্রকাশ্যে বলেছিলেন শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানকে দশ কোটি টাকা দিয়ে তিনি নৌকা প্রতীক এনেছেন। নির্বাচনে তাকে কোনো কোনো কেন্দ্রে ৯৮ ভাগ ভোট কাস্টিং দেখিয়ে পাস করানো হয়। যা নিয়ে ভোটের দিন থেকে নিয়ে আজও পর্যন্ত বিতর্ক রয়েছে আলীরটেকের সাধারন ভোটারদের মাঝে। টোকার জোরে ওসমানদের তুষ্ট করে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান হওয়ায় জাকিরকে নিজেদের জনপ্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিতে পারেননি আলীরটেকের বহু ভোটার। এরই মাঝে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন ও ওসমানরা পালিয়ে গেলে জাকিরকে অপসারণের দাবি জোরালো হয় আলীরটেকের বাসিন্দাদের মাঝে।

এরই অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবিতে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন আলীরটেক ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দরা। এ সময় আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের বিজয়ী চেয়ারম্যান জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ নিরীহ মানুষদের নানাভাবে হয়রানির অভিযোগ আনেন তারা। এরপরও বহাল তবিয়তে রয়েছে এই ঘি জাকির।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি নিয়মিত মণ্ডলপাড়া এলাকায় তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে যাতায়াত করছেন, আলীরটেক ইউনিয়ন এলাকাতেও নিয়মিত যাতায়াত করছেন বলে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নিহত হওয়ার একাধিক ছাত্র হত্যা মামলার আসামি হয়েও এভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখে বিস্মিত হয়েছেন আলীরটেকের লোকজন। এখনও পর্যন্ত এসব মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার না করাতেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন এলাকাবাসী।
এদিকে, আলীরটেক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোনে সংযোগ না পাওয়ায় কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >