নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রত্যাশী মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন। তিনি ২০০১ সালে আসনটিতে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। এবারো মনোনয়নের জন্য উঠে পরে লেগেছেন। কিন্তু তার ললাটে বারংবার জুটেছে শত সহস্র দূর্নীতি আর অপকর্মের তকমা।
সাবেক সংসদ সদস্য “মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন” এলাকার রাজনীতিতে যার নাম উচ্চারণ মানেই বিতর্ক, বিভাজন আর একের পর এক রুদ্ধশ্বাস অভিযোগ। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই পুরোনো খাতাগুলো ফের জনমনে তীব্র আলোড়ন তুলেছে।
এই সময় ঠিক যেনো, গিয়াসউদ্দিন এর দুর্নীতি, ক্ষমতার রাজত্ব আর নৃশংস সহিংসতার অন্ধকার অধ্যায়কে আরো একবার নতুন করে উল্টে দেখার সময়।
গিয়াসউদ্দিন রাজনীতিতে তার প্রতিপক্ষকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারেন না। সব সময় তিনি চান একক নিয়ন্ত্রন। যেটা তিনি করেছেন ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। ওই সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ত্যাগি নেতারাও সাইজ হয়ে গেছেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির ত্যাগি নেতা গাজী ইসমাইল তো মারাই গেলেন। আর বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেনের অবস্থা সবাই জানে। বিএনপির এই দুই শীর্ষ নেতা তৎকালীন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কৃষকলীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দেয়া গিয়াসউদ্দিন ওই দুই শীর্ষ নেতার রাজনীতি ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এতে গিয়াসউদ্দিন তার একক ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেছিলেন।
গিয়াসউদ্দিন ১৪টি চুন শিল্প থেকে ৩কোটি টাকা চাঁদাবাজি করেছিলেন। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর চুন প্রস্তুতকারক সমিতির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুন্দর আলী খুন হন,একই বছর খুন হন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মোজাফফর হোসেন। ২০০৩ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী জেলা বিএনপির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই সাব্বির আলম খন্দকার খুন হন।সে সময়ে তৈমুর আলম গিয়াসউদ্দিন এবং তার শ্যালক জুয়েলসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। এবং এই বছরেরই ১৬ই ডিসেম্বর সানাড়পার এর আওয়ামী নেতা হাজী কফিলউদ্দিন খুন হন।এরপর পরই গিয়াসউদ্দিন সানাড়পারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছিলেন। উপরের উল্লেখিত সবকটি খুনের পেছনেই গিয়াসউদ্দিন এর হাত আছে এমন তথ্য উঠে এসেছিলো স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে।

২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সম্মেলনে কাউন্সিলর ইকবালের নেতৃত্বে হামলা চালানো হয়েছিলো। এতে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছিলো এবং পন্ড হয়ে গিয়েছিলো সম্মেলন। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের বক্তব্যানুযায়ী, ইকবাল গিয়াস উদ্দিনের অন্যতম সহযোগি। গিয়াস উদ্দিনের পরামর্শে সে আওয়ামীলীগের একটি অংশের সঙ্গে মিলে মিশে কাজ করতো। যাতে অপরাধ অপকর্ম করেও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের ঝামেলা এড়িয়ে যাওয়া যেত।
২০২২ সালের ২৫ এপ্রিল রাতে রাজধানীর পুরানা পল্টনে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে এলোপাথারী ছুরিকাঘাত করে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলো দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে গিয়াসউদ্দিনের ছেলে গোলাম মোঃ কাউসার রিফাতের নাম উঠে আসে বলে পুলিশ সূত্রে জানা যায়। এ ঘটনায় রিফাতের সহযোগী হিসেবে মোঃ হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়।এই হত্যার পরিকল্পনায় নিজের ছেলের নাম উঠে আসায় পুলিশ দেখে পালাতে হয়েছিলো গিয়াস উদ্দিনকে।

২০২৪ সালের মে মাসে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক মামলায় কারাগারে পাঠানোর হয়েছিলো গিয়াসউদ্দিনকে। ২০২৪ সালের ১২ মে (রবিবার) ঢাকা মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আস সামছ জগলুল হোসেনের আদালতে আত্মসমর্পণ করেছিলেন গিয়াসউদ্দিন। জামিনের আবেদন করলে উক্ত মামলায় গিয়াস উদ্দিন উচ্চ আদালত থেকে ছয় সপ্তাহের জামিন পান। গিয়াসউদ্দিনের আয়কর নথি অনুযায়ী কাসসাফ শপিং সেন্টার-১ নির্মাণ ব্যয় প্রদর্শনকালে ২০২১-২০২২ করবর্ষে মার্কেটের ৮০২ বর্গমিটার নির্মাণে ১ কোটি ৪১ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩১ টাকা বিনিয়োগের বিষয়ে বৈধ উৎস পায়নি দুদক। যা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হলে তার জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানা বিএনপির উদ্যোগে চাঁদপুর মোহনায় এক বনভোজন অনুষ্ঠানে, বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই এবং টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন বিক্রি হয় বলে গিয়াসউদ্দিন দলটির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। এই ঘটনার একটি ভিডিও সে সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিলো।
বিএনপিতে গণতন্ত্র নেই উল্লেখ করে গিয়াসউদ্দিন বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক দল বিএনপির কথা বলি। নিজ দলের কথা বলি। বিএনপির গঠনতন্ত্রে কী বলে? গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এই দল গঠিত ও পরিচালিত হবে। কিন্তু সেটা কী চলে? একদম স্পষ্ট না। যদি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাদের এই দল চলতো তাহলে নেতাকর্মীরা যারা হতাশা, দুঃখ-বেদনা নিয়ে বক্তব্য দিলেন, তাদের এই দুঃখ-দুর্দশা থাকতো না। দলের মধ্যে গণতন্ত্র থাকবে না। আর আমরা সারা দিন চিৎকার করবো, রাষ্ট্রে গণতন্ত্র চাই। তা চাইলেই কি হয়ে যাবে? এই চাওয়াটাও তো অন্যায়। নিজের দলের মধ্যে গণতন্ত্র নাই। আর রাষ্ট্রের কাছে গণতন্ত্র চাই। এটা কী হতে পারে? এটা তো হতে পারে না।’

বিএনপি দলের হাইকমান্ডের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে গিয়াসউদ্দিন আরও বলেছিলেন, ‘গঠনতন্ত্র তৈরি হয়েছে দল পরিচালনা করার জন্য। সেখানে লেখা হয়েছে, সর্বস্তরের কমিটি নির্বাচিত হতে হবে কাউন্সিলের ভোটের মাধ্যমে। এই অধিকার আমাদের না দিয়ে অ্যাপয়েন্টেড নেতাকর্মী বানানো হয়। কেন্দ্র থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় যেন চাকরি করি আমরা, গোলামি করি, আমরা দাসত্ব করি।
বিএনপিতে টাকা দিয়ে মনোনয়ন বিক্রি হয় উল্লেখ করে গিয়াসউদ্দিন বলেছিলেন, ‘এই নির্বাচনের মধ্যে কোটি কোটি টাকায় মনোনয়ন বিক্রি করা হয়। এ দেশ আমরা এই কারণেই স্বাধীন করেছি? এজন্য আমরা আন্দোলন করি সংগ্রাম করি? নিশ্চয়ই না। ভালো মানুষের অভাব নেই বিএনপিতে। ভালো মানুষের অভাব নেই অন্য কোনও দলেও। কিন্তু ভালো মানুষগুলোর টাকা না থাকলে সমস্যা। সে নমিনেশন পাবে না। কারণ টাকার গাট্টি দিয়ে দিতে হবে। এমন রাজনীতি যদি দেশে থাকে তাহলে বাংলাদেশের আকাশে কখনও ভালো সূর্য উদয় হবে না।
প্রশ্ন থেকেই যায়, শত-সহস্র অপকর্ম আর দুর্নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ এবং নিজের দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এমন একজন নেতা জনগণের কল্যান সাধনে কতখানি যৌক্তিক ভূমিকা পালন করবে?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনকে ঘিরে নতুন–পুরোনো অভিযোগ, বিভিন্ন মামলা, দলীয় অভ্যন্তরীণ সমালোচনা ও ব্যক্তিগত বক্তব্য সবকিছু মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের রাজনীতি আবারও সরগরম হয়ে উঠেছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, এতগুলো বিতর্ক ও মামলার চাপ তার রাজনৈতিক যাত্রায় বড় প্রশ্ন তৈরী করেছে ; তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে আদালত, দলীয় হাইকমান্ড এবং অবশ্যই জনগণের ভোট।






