আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। জেলার ৫টি আসনের মধ্যে ৪টিতে দল মনোনয়ন দিলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকা নারায়ণগঞ্জ–৪ আসন এবার আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।নারায়ণগঞ্জ-৪ কে ‘অঘোষিত’ রাখায় প্রশ্ন বাড়ছে রাজনৈতিক মহলে। মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতর বেড়েছে টানাপোড়েন এবং এই অনিশ্চয়তাকে ঘিরে দলের স্থানীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বাড়ছে সমান তালে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নারায়ণগঞ্জ–৪ এ সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, সংঘাতমুক্ত এবং জয়ের সম্ভাবনায় এগিয়ে থাকা প্রার্থী খুঁজতেই হয়তো এতটা সময় নিচ্ছে। এ আসনে অন্তত তিনজন শক্তিশালী প্রার্থী,পক্ষ অবলম্বন করে মাঠে কাজ করছে। যার ফলে মনোনয়ন ঘোষণা করলেই দলীয় সমীকরণে ভাঙন দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই সম্ভবত দল সিদ্ধান্তটি ঝুলিয়ে রেখেছে।
এমন পরিস্থিতিতে, নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিতে নিজ প্রচারণা ও জনসমর্থন সুদৃঢ় করতে জোরালো ভাবে মাঠে নেমেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের আহ্বায়ক এবং বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর বৃহদাকার নির্বাচনী ব্যানার টাঙানো হচ্ছে । সড়ক-মহাসড়ক জুড়ে তাঁর দৃষ্টিনন্দন এবং বড় আকারের ব্যানারগুলো চোখে পড়েছে । ব্যানারে ধানের শীষে ভোট চাওয়ার আহ্বান এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে যা নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের প্রচারণার দিক থেকে যথেষ্ট সাহসী ও স্পষ্ট পরিষ্কার বার্তা।

মোহাম্মদ আলীকে ঘিরে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দল ও মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর অবদান, ত্যাগ আর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনিই এ আসনে যোগ্য প্রার্থী। কেউ কেউ বলছেন, এটি শুধু প্রচারণা নয় কেন্দ্রকে বার্তা দেওয়ার একটি সরাসরি কৌশল। এমন ব্যানার আর ফ্যাস্টুন যেনো জোর গলায় জানান দিচ্ছে তিনি মাঠে প্রস্তুত এবং সংগঠনের ভেতর গ্রহণযোগ্যতাও তারই পক্ষে।
অন্যদিকে একই আসনে রয়েছেন বিএনপির আরো দুই শক্তিশালী প্রার্থী। একজন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন । অপরজন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম। নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনে এই দু’জন প্রার্থীর মধ্যে একজন ব্যবসায়ী–কেন্দ্রিক প্রার্থী এবং আরেকজন সংগঠনের পুরনো মুখ। কিন্তু এদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া । কারও বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, কারও ক্ষেত্রে সক্ষমতা নিয়ে সংশয়। কেউ একাধারে বিভিন্ন আসনে নিজের অবস্থান নিয়ে সংশিত।কখনো ৩ কখনো ৪ আসনে নিজেকে মেলে ধরতে গিয়ে নিজেই হয়ে যাচ্ছেন ছন্নছাড়া। আবার কেউ দলের ক্রান্তিলগ্নে ছেড়ে গিয়েছেন বিএনপিকে। নিজেকে বাঁচিয়ে দলকে ছুড়ে ফেলেছেন ঘোর বিপদে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন মনোনয়ন তালিকা প্রকাশের আগে থেকেই সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন ওয়ার্ডসহ পুরো নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালায় কিন্তু হাই কমান্ড নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে গিয়াসউদ্দিন এর চাইতে যোগ্য প্রার্থী মনে করে বেছে নেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান’কে। বিএনপি ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে সারা দেশে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য ২৩৭ জন প্রার্থীর প্রাথমিক তালিকা ঘোষণা করে। এরপর থেকেই যেনো দিশেহারা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। কখনো, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজের তৃণমূল নেতাকর্মীদের দিয়ে করাচ্ছেন বিক্ষোভ মিছিল, আবার ১৮ই নভেম্বর গিয়াসউদ্দিন নিজেই সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের সাথে হাত মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মনোনয়ন পরিবর্তন করার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। গিয়াসউদ্দিন থেমে থাকার পাত্র নয়,এক আসন না পেলেও অন্য আসনের দিকে বাকা নয়নে তাকিয়েছেন এই নেতা। গিয়াসউদ্দিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ও বিভিন্ন জায়গায় মিটিং-মিছিল করতে দেখা গেছে। মনোনয়ন দৌড়ে, ক্ষমতা গ্রহণে নাছোড়বান্দা মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন কেমন যেনো দুই নৌকায় পা দিয়ে টালমাটাল হয়েই নিজের নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয় কিছু সংবাদ মাধ্যম ইতোমধ্যেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মের তালিকা প্রকাশ করেছে , ১। ১৫টি চুন তৈরীর কারখানা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন গিয়াসউদ্দিন, ২। চিটাগং রোডের হাবিবুল্লাহ টাওয়ার ও বদোরুদ্দিন শপিং কমপ্লেক্স নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি, ৩। সানারপাড় কবরস্থান ও ঈদ্গাহ এর জমি দখল করে সেখানে নিজের স্কুলের সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন গিয়াসউদ্দিন, ৪। চিটাগংরোড এলাকার আন্ত জেলা ট্রাক সহ বিভিন্ন সংগঠন দখলে নেন গিয়াসউদ্দিন এর লোক ইকবাল ও আইয়ুব মুন্সী, ৫। কাঁচপুর সেতুর নিচে পাথর ও বালুর প্রায় ৫০ টি গদি নিয়ন্ত্রণ করেন গিয়াসপুত্র রিফাত ।এমন আরো বেশ কিছু অপকর্মের তথ্য ফাস হয়েছে গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, ফতুল্লার মোহাম্মদ শাহ আলম নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সুবিধাবাদী নেতাদের মধ্যে অন্যতম। বিএনপির দুঃসময়ে তিনি নিজেকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রেখেছিলেন। আন্দোলন সংগ্রামে তার দেখা পাওয়া যায়নি কিন্তু ৫ আগস্টের পর আবার দৃশ্যপটে হাজির হয়েছেন এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন থেকে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন ও প্রত্যাশা করছেন তিনি। বছরের পর বছর রাজনীতির সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও জাতীয় নির্বাচন এলেই নড়াচড়া শুরু করেন এই শিল্পপতি নেতা। নির্বাচনে মনোনয়ন না পেলে আবার গা ঢাকা দেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ফতুল্লার ব্যবসায়ী মোঃ শাহ আলম। যিনি বিগত সময়ে কল্যাণ পার্টির নেতা ছিলেন। সেখান থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষের প্রতীক নিয়ে এই আসনেই নির্বাচন করেছিলেন কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় না আসায় আর রাজনীতির মাঠে তাকে দেখা যায়নি। এমনকি ঘোষণা দিয়ে বিএনপির সকল পদ পদবী থেকে পদত্যাগও করেছিলেন শাহ আলম। দুঃসময়ের আন্দোলন সংগ্রামে যখন সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীরা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে তখন শাহ আলম পুরোপুরি ব্যবসায়ী মেজাজে আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে সমান তালে ব্যবসা করেছেন, কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। অদ্ভুতভাবে নির্বাচন এলেই ঘুম ভাঙ্গে এই দুধের মাছি মোহাম্মদ শাহ আলমের।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে বিএনপি হাইকমান্ড এখন গভীর বিশ্লেষণে ব্যস্ত। বিএনপি এবার ক্লিন ইমেজ, জনপ্রিয় ও ত্যাগী নেতাকে মনোনয়ন দিচ্ছে। এমন ক্লিন ইমেজ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ে কে কতখানি এগিয়ে থাকবেন গিয়াসউদ্দিন এবং শাহ আলমের মতো বিতর্কিত নেতারা ?
এমতাবস্থায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী এই দুই নেতার চাইতে বেশ অনেকটাই ক্লিন ইমেজ বজায় রেখেছেন। দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করছে, নারায়ণগঞ্জ-৪ এ ভিন্ন দলের প্রার্থীকে টেক্কা দিতে হলে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও গ্রহনযোগ্যতার দিক থেকে কেবলমাত্র মোহাম্মদ আলী একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন। কেননা, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ও বীরত্বভিত্তিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডে নেতৃত্ব থাকায় প্রবীণ ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে আলাদা প্রভাবে আছেন এই নেতা। সাবেক সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত মুখ হওয়ায় এলাকায় তাঁর সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও ভোটব্যাংক দীর্ঘদিনের। স্থানীয় ও স্থায়ী নেতৃত্ব হওয়ায় তৃণমূল তাঁর প্রতি বেশি আস্থাশীল।
মনোনয়ন এখনো ঘোষণা না হওয়ায় বিভিন্ন গ্রুপিং এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক লবিং চলছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে মাঠের বাস্তবতা ও জয়ের সম্ভাবনাকেই প্রাধান্য দেবে বলে জানা গেছে। মনোনয়ন ঘোষণা না হওয়া, বাড়তে থাকা প্রচারণা, এবং ব্যানারের দৃশ্যমানতা সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ–৪ এখন জটিল কিন্তু উত্তপ্ত রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দু।
তবে কয়েকদিন ধরে, শহরের বিভিন্ন এলাকায় বৃহদাকার নির্বাচনী ব্যানার, ধানের শীষে ভোটের আহ্বান, এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয় সব মিলিয়ে বিএনপির দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে মোহাম্মদ আলী এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও ভোটের মাঠে দৃশ্যমান নাম।
বিশেষ সূত্র বলছে, ব্যানার দেখে এলাকার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে, তবে কি মোহাম্মদ আলী’ই শেষ পর্যন্ত দলের চূড়ান্ত পছন্দ হয়ে পাচ্ছেন দলীয় মনোনয়ন?






