নারায়ণগঞ্জের বন্দরে লোকালয়ে ঢুকে পড়া সেই কুমিরটির নয় দিন পর আবারও দেখা মিলেছে। এতে নদী ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। তবে কুমিরটির অবস্থান এখনও নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরের পর উপজেলার সাব্দী এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদে কুমিরটি দেখা গেছে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয়দের পাঠানো একটি ভিডিও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিবানী সরকারের কাছে পৌঁছালেও সেটি দেখে কুমিরটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয়দের ধারণা, কুমিরটি লোকালয় থেকে সরে গিয়ে সাব্দী নদে অবস্থান করছে।
বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শিবানী সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, লোকালয়ে যে কুমিরটি দেখা গিয়েছিল, সেটি আমরা সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করছি। স্থানীয় জনসাধারণের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুমিরটি লোকালয় থেকে সরে গিয়ে সর্বশেষ আজ সাব্দী নদে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, আমরা সময় সময় ঢাকার বন্যপ্রাণী ইউনিটকে বিষয়টি জানাচ্ছি এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও বন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। কুমিরটি কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পাওয়া গেলে সেটিকে উদ্ধার করে সংশ্লিষ্টদের হেফাজতে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
উদ্ধার অভিযান প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, ইতিপূর্বে আমরা উদ্ধার অভিযান চালিয়েছি। দুই-তিনটি অভিযান করেছি। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ এলাকায় কুমিরটিকে পাওয়া যায়নি। এ কারণে আমরা সফল হতে পারিনি।
সর্বশেষ কুমিরটি দেখার তথ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আজ একজন স্থানীয় ব্যক্তি আমাকে ফোন করে একটি ভিডিও পাঠিয়েছেন। ভিডিওটি দেখে আমি খুব নিশ্চিত হতে পারছি না, যেহেতু আমি সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলাম না। তবে স্থানীয় আরও দু-একজন জানিয়েছেন, কুমিরটি সর্বশেষ সাব্দী নদে দেখা গেছে। ওই ব্যক্তি আনুমানিক বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার দিকে তাকে ফোন করে বিষয়টি জানান বলেও উল্লেখ করেন ইউএনও।
গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে বন্দরের তিনগাঁও এলাকায় প্রথম কুমিরটির দেখা মেলে। পরে লোকালয়ে কুমিরটির চলাচলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। পরদিন বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কুমিরটির উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে একটি পুকুরে কুমিরটিকে দেখা যায়। পরে সেটি লোকালয়ে উঠে পাশের আরেকটি পুকুরে চলে যায়। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ ওই পুকুরে কুমিরটি অবস্থান করছে বলে ধারণা করা হলেও ঘন কচুরিপানার কারণে সেটির অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এরপর বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান চালান। তবে নির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করতে না পারায় এখনো কুমিরটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
নয় দিন পর নতুন করে সাব্দী নদে কুমিরটি দেখা যাওয়ার তথ্য পাওয়ায় নদী ও এর আশপাশের এলাকায় উদ্ধার তৎপরতায় গুরুত্ব দিয়েছে প্রশাসন। তবে প্রশাসন বলছে, কুমিরটির অবস্থান নির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা গেলে দ্রুত সেটিকে উদ্ধার করা হবে।
কুমিরের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই তিনগাঁও ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নদী ও জলাশয়কেন্দ্রিক চলাচলে সতর্কতা বেড়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা।
একই সঙ্গে কুমিরটি দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষও ভিড় করছেন। এতে কুমিরটির জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি উৎসুক মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় প্রশাসনের।
এ পরিস্থিতিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হচ্ছে। শিশুদের অভিভাবক ছাড়া পুকুরে না নামতে দেওয়া, গবাদিপশুর নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং কুমিরটির কোনো ক্ষতি না করার জন্য স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইউএনও শিবানী সরকার এশিয়া পোস্টকে আরও বলেন, আমরা ইতোমধ্যে স্থানীয়দের সতর্ক করেছি। গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছি এবং আমার ফেসবুক প্রোফাইলেও সেটি আপলোড করা আছে। সময় সময় মাইকিং করেও এলাকাবাসীকে জানানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ছোট ছেলেমেয়েদের অভিভাবক ছাড়া এ মুহূর্তে পুকুরে নামতে না দেওয়া, গবাদিপশুর নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ বিভিন্ন সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীটিরও যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়েও সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। কোথাও কুমিরটি দেখা গেলে বা এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কুমিরটিকে কোনো নির্দিষ্ট স্থানে দেখা গেলে দ্রুত উদ্ধারকারী দলকে খবর দেওয়া হবে। এরই মধ্যে বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে উপজেলা প্রশাসন।
তবে নয় দিন ধরে লোকালয় ও জলাশয় ঘিরে কুমিরটির বিচরণ এবং এখনও সেটিকে উদ্ধার করতে না পারায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। নদী, পুকুর ও জলাশয়সংলগ্ন বাসিন্দারা কুমিরটির দ্রুত উদ্ধার চান। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুমিরটি উদ্ধারের পাশাপাশি সেটিরও যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।




