৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের সংঘর্ষ ও হাতাহাতির ঘটনার পর নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে আদালতপাড়ায়। প্রকাশ্যে ঘটনাটি তাৎক্ষণিক বিরোধ ও উত্তেজনার ফল বলে মনে হলেও, এর নেপথ্যে আইনজীবী সমিতির নেতৃত্ব, আসন্ন নির্বাচন, পেশাগত প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার নানা সমীকরণ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এক বছর আগের সংবাদ সম্মেলনে সাখাওয়াতকে নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগচাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন গালিবএবার একই ব্যক্তিকে দেখা গেল সাখাওয়াতের পাশেআইনজীবী ফোরাম থেকে গালিব-রেজাসহ তিনজন বহিষ্কারShare this news as a Photo Card
এরই মধ্যে ৭ অক্টোবর আদালতপাড়ায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে অ্যাডভোকেট শেখ মো. গোলাম মোর্শেদ গালিবের সঙ্গে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবীদের একটি অংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
আইনজীবীদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, গত আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে গালিব প্রকাশ্যে সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন, সেই গালিবই এখন কীভাবে তার পাশে বসছেন?
এক বছর আগের সংবাদ সম্মেলনে সাখাওয়াতকে নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট আদালতপাড়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট শেখ মো. গোলাম মোর্শেদ গালিব সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলেছিলেন। ওই সময় গালিব ছিলেন ‘রেজা-গালিব’ প্যানেলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী।
সংবাদ সম্মেলনে গালিব দাবি করেন, ২০২৪ সালের আইনজীবী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘নির্বাচন বাণিজ্য’ হয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিএনপির আদর্শ ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। সাধারণ আইনজীবীদের অধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
গালিবের অভিযোগ ছিল, আইনজীবী সমিতির দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষকে কথিত ‘টর্চার সেল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার দাবি, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মনোনয়ন ও ‘সিলেকশন বাণিজ্যের’ প্রতিবাদকারীদের ওই স্থানে জিম্মি করে সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, একজন আইনজীবীকে সেখানে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের ১২ আগস্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালাউদ্দিন ভূঁইয়া সবুজকে তার স্ত্রীর সামনে মারধর করা হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
ওই সংবাদ সম্মেলনে গালিব নারায়ণগঞ্জ বারের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, জামিন বাণিজ্য, ঘুষ ও তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি ছিল, আইনজীবী সমিতির পরিবেশকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করে আদালতের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা প্রয়োজন।
সাখাওয়াত হোসেন খানকে নিয়ে রাজনৈতিক ও পেশাগত নানা অভিযোগও করেন গালিব। তার বক্তব্যে সাখাওয়াতের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
গালিব দাবি করেন, সাখাওয়াত হোসেন খানের স্ত্রী অ্যাডভোকেট শামীমা একসময় সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম ওসমানের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব বক্তব্য ছিল গালিবের অভিযোগ ও রাজনৈতিক বক্তব্য; সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য বা অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও তুলেছিলেন গালিব
ওই সংবাদ সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান মাসুদকে নিয়েও সাখাওয়াত হোসেন খানের বক্তব্যের সমালোচনা করেন গালিব।
গালিব দাবি করেন, যে ব্যবসায়ীকে নিয়ে সাখাওয়াত সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন, অতীতে তার কাছ থেকেই সাখাওয়াত অর্থ গ্রহণ করেছেন। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বসে ওই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
এবার একই ব্যক্তিকে দেখা গেল সাখাওয়াতের পাশে
পুরোনো এসব অভিযোগের মধ্যেই ৬ অক্টোবর আইনজীবী সমিতিতে দুই পক্ষের সংঘর্ষের পরদিন ৭ অক্টোবর সাখাওয়াত হোসেন খান ও শেখ মো. গোলাম মোর্শেদ গালিবকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়।
এ দৃশ্য আদালতপাড়ায় নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অনেক আইনজীবীর প্রশ্ন—এক বছর আগে যিনি প্রকাশ্যে সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন, তিনি এখন কীভাবে তার সঙ্গে একই অবস্থানে রয়েছেন?
তবে এ বিষয়ে গালিবের বর্তমান অবস্থান কিংবা ২০২৫ সালের অভিযোগগুলো নিয়ে তিনি নতুন কোনো ব্যাখ্যা দিয়েছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।
আইনজীবী ফোরাম থেকে গালিব-রেজাসহ তিনজন বহিষ্কার
এদিকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে শেখ মো. গোলাম মোর্শেদ গালিব, মোহাম্মদ কামাল হোসেন মোল্লা এবং রেজাউল করিম খান রেজাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক মো. জিয়াউর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনের স্বার্থবিরোধী ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যক্রমের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলে ৬ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর আদালতপাড়ায় উত্তেজনার পাশাপাশি আইনজীবী রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। একদিকে আসন্ন আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, অন্যদিকে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, পুরোনো অভিযোগ ও বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
তবে ৬ অক্টোবরের সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ, কারা দায়ী এবং ঘটনাটির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও আইনগত পদক্ষেপই পরবর্তী পরিস্থিতি পরিষ্কার করবে।





