নারায়ণগঞ্জ ।
,

টিকাদানে রেকর্ডের পরও কেন হাজারো প্রাণহানি

ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের (আইডিএইচ) নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই গত ২৭ আগস্ট মারা যায় এক বছর বয়সী সাইফ হাসান। দক্ষিণাঞ্চলের জেলা শরীয়তপুরের এই শিশুটি কয়েক দিন আগেই হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছিল। এরপর তার জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তার পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়েছিল, টিকা দেওয়ার কারণে হয়তো শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে।

তবে হাসপাতালের জুনিয়র কনসালট্যান্ট শ্রিবাস পাল বলেন, সাইফের আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের একটি রোগের চিকিৎসা চলছিল। সম্ভবত টিকা সুরক্ষা দেওয়ার আগেই সে হামে আক্রান্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এরপর সংক্রমণ তার শারীরিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেয়।’

হামের মহামারি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তারই একটি চিত্র শিশু সাইফের মৃত্যু । ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামজনিত কারণে ১ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশে মোট ১৩২টি হাম শনাক্ত হয়েছিল, তবে কোনো মৃত্যু হয়নি। এই সময়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ কোটি টিকা দেওয়ার পরও এই হাজারের বেশি মৃত্যু ঘটেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৯ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়া রোগী রয়েছে ১০০ জন এবং সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ৯০৯ জন। অথচ একই সরকারি তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর থেকে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সেখা লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক এই সংখ্যাই মহামারী নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সমস্যাগুলোর একটি চিত্র তুলে ধরে। একদিকে টিকা প্রয়োজন এমন শিশুর প্রাথমিক হিসাব ছিল কম, অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ের টিকাদান কভারেজের পরিসংখ্যান এমন কিছু এলাকা আড়াল করতে পারে, যেখানে বিপুলসংখ্যক টিকাবিহীন শিশু এখনও রয়েছে।

সমস্যার হিসাবেই ছিল ঘাটতি : হামের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের পড়া কোনো রাতারাতি ঘটনা নয়। প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের এই দক্ষিণ এশীয় দেশটি একসময় হাম নির্মূলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় ক্রমেই আরও বেশি শিশু হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

বাংলাদেশের ২০২৩ সালের কাভারেজ মূল্যায়ন জরিপ অনুযায়ী, হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ২০১৯ সালে ছিল ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা কমে ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণের হার ৮৯ শতাংশ থেকে কমে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে যায়।

কোভিড-১৯ মহামারীর সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ ছাড়া ইউনিসেফ তাদের প্রতিবেদনে শিশুদের টিকা না নেওয়ার পেছনে অপতথ্য এবং টিকা নিয়ে অনীহাকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এ ছাড়া চলতি বছরের উদ্যোগের আগে বাংলাদেশে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকার কোনো সম্পূরক কর্মসূচি নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ এমন কর্মসূচি হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। ফলে টিকাদানের হার প্রায় ৯৫ শতাংশের নিচে থেকে যায়। হামের সংক্রমণ বন্ধে এই মাত্রার কভারেজ প্রয়োজন বলে মনে করা হয়। এর ফলে পরপর কয়েক বছরে হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশের টিকাদান কর্মসূচিতেও বিঘ্ন ঘটে।

বাংলাদেশের ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, সরকার পরিবর্তনের কারণে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকার ঘাটতি দেখা দেয়।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে হাম আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে এবং মার্চে তা দ্রুত বেড়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) দেশব্যাপী হাম ছড়িয়ে পড়ার কথা জানায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হাম শনাক্ত হয়।

চলমান সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করলে কর্তৃপক্ষ ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি টিকাদান শুরু করে। এরপর এপ্রিলের শেষ দিকে দেশব্যাপী কর্মসূচি শুরু হয়। ২০ এপ্রিল হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালুর সময় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু এর প্রায় দুই মাস পর, ২৮ জুন সরকার একই বয়সসীমার প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়ার কর্মসূচি নেয়। অর্থাৎ দুই কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ শিশুর পার্থক্য ছিল। এই ব্যবধানই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কীভাবে বাংলাদেশ এখন প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা জানাতে পারছে। এই সংখ্যা প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। তারপরও হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সন্ধান মিলছে।

টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে যে জনসংখ্যার হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইইডিসিআরের মুশতাক হোসেন। তার মতে, এতে টিকা পাওয়ার যোগ্য শিশুর সংখ্যা কম করে ধরা হয়েছিল। দেশব্যাপী গড় পরিসংখ্যানও স্থানীয় পর্যায়ের ঘাটতি আড়াল করতে পারে। মুশতাক হোসেন বলেন, আপনাকে সমতা নিশ্চিত করতে হবে।’ তার মতে, দুর্গম ও চলমান জনগোষ্ঠীসহ প্রতিটি সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে।

সংখ্যাগুলো যা আড়াল করতে পারে : হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। ফলে টিকা না নেওয়া মানুষের তুলনামূলক ছোট কোনো গোষ্ঠীও সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

মুশতাক হোসেন বলেন, জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের গড় হার বেশি হলেও পৃথক কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি আড়ালে থেকে যেতে পারে। এর ফলে ভাইরাসের সংক্রমণ অব্যাহত থাকতে পারে।

বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচিতে দীর্ঘদিন কাজ করা আরেকজন মহামারী বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বয়স, টিকা নেওয়ার ইতিহাস ও অবস্থান অনুযায়ী আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং এর মাধ্যমে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী শনাক্ত করা দরকার।

ওই মহামারী বিশেষজ্ঞ বলেন, এসব জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টিকা না দিলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা কমে গেলেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া চিকিৎসকেরাও এসব ঘাটতির প্রমাণ দেখতে পাচ্ছেন।

ঢাকার আইডিএইচের চিকিৎসক শ্রিবাস পাল আল জাজিরাকে বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম রোগীদের বেশির ভাগই টিকা নেয়নি। বর্তমানে চিকিৎসাধীন কিছু শিশু টিকাদান কর্মসূচির সময় অসুস্থ থাকায় টিকা নিতে পারেনি। তবে হাসপাতালটিতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কমেছে বলে জানান পাল। তার মতে, এতে বোঝা যায় টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। তবুও শিশুরা এখনও হাসপাতালে আসছে।

নিয়মিত টিকা পাওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে শিশুরা : হামের প্রাদুর্ভাব কেন এত প্রাণঘাতী হয়েছে, তার আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় আইডিএইচের মৃত্যুর পর্যালোচনা থেকে। গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালটিতে চলতি বছর ৩ হাজার ১৬৭টি সন্দেহভাজন হাম রোগী, পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ৫৩৭টি হাম এবং নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন হামজনিত ৫৭টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

এসব মৃত্যু মূলত খুব অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটেছে। মারা যাওয়া ৫৭ জনের মধ্যে ৪৯ জন, প্রায় ৮৬ শতাংশ ছিল ১৫ মাসের কম বয়সী। আর ৩১ জনের বয়স ছিল নয় মাসের কম। বাংলাদেশে সাধারণত নয় মাস বয়সে শিশুদের হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়।

হাসপাতালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মারা যাওয়া ৫৭ জনের মধ্যে ৪৭ জন— ৮৩ শতাংশ কোনো হাম টিকা নেয়নি। নথিভুক্ত ৫০টি মৃত্যুর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ছিল— যা সবচেয়ে বেশি দায়ী জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

শ্রিবাস পাল বলেন, নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর আগেই হাম আক্রান্ত হওয়া শিশুদের নিয়ে চিকিৎসকেরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।

সংক্রমণের পেছনে থাকা কারণগুলো আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য আইডিএইচ নয় মাস বয়সের আগে আক্রান্ত হওয়া শিশু এবং তাদের মায়েদের নিয়ে গবেষণা করছে। তবে হাসপাতালের তথ্যকে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় বলে জানান শ্রিবাস পাল। তার ভাষ্য, আইডিএইচ একটি বিশেষায়িত রেফারেল হাসপাতাল, যেখানে ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকা থেকে গুরুতর রোগীদের পাঠানো হয়। তবু হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে কোন শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে, হাসপাতালের এসব পরিসংখ্যান তার একটি চিত্র তুলে ধরবে।

এদিকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, আক্রান্তের যে সংখ্যা জানা যাচ্ছে, তাতে প্রকৃত পুরো পরিস্থিতি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

সরকারের জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির তদারকির দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ বলেন, কর্তৃপক্ষ আরও এক দফা টিকাদানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই কর্মসূচি শুরু হতে পারে।

আরেক দফা টিকাদান কি সংক্রমণ থামাতে পারবে : পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে আগের দফাগুলোতে টিকা না পাওয়া শিশুদের কাছে পৌঁছানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন করে বড় জাতীয় টিকাদান কভারেজের সংখ্যা দেখানোর চেয়ে মাইক্রো-প্ল্যানিংয়ের ওপর বেশি সাফল্য নির্ভর করবে। অর্থাৎ কোন কোন শিশু ঝুঁকিতে আছে, তা এলাকাভিত্তিক শনাক্ত করা এবং টিকাদানকারীরা যাতে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেন, তা নিশ্চিত করা।

মুশতাক হোসেন বলেন, নজরদারিতে যদি বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি শনাক্ত হয়, তাহলে বয়স্ক শিশুদেরও টিকাদানের আওতায় আনার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনা করা উচিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মহামারী বিশেষজ্ঞ বলেন, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনার প্রয়োজন হতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের অনেক পরিবারের জন্য ইতোমধ্যে সেটাও অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেসব ঘাটতির ফাঁক দিয়ে আক্রান্ত হওয়া শিশুদের একজন ছিল মধ্য-পূর্বাঞ্চলীয় কিশোরগঞ্জ জেলার নয় মাস বয়সী মোস্তাকিম। তাকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। গত ৩০ আগস্ট আইডিএইচে তার মৃত্যু হয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >