নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা ইউনিয়নের সস্তাপুর ও কায়েমপুর এলাকায় সরকারি সহায়তা কর্মসূচির পণ্য ও সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ওএমএস ডিলার আহম্মদের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, খোলা বাজারে পণ্য বিক্রয় (ওএমএস) এবং ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়ার কথা বলে নিম্নআয়ের মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা আদায় করা হয়েছে। সরকারি সহায়তার আওতায় বিনামূল্যে বা নির্ধারিত মূল্যে পাওয়ার কথা থাকা সুবিধা নিয়েই যদি টাকা আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু অনিয়ম নয়—সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে ওএমএস কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন আহম্মদ। তার বিরুদ্ধে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া, কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ আদায় এবং সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে ক্ষোভ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে অনেকে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না।
‘ক্ষমতার ছায়ায়’ অনিয়মের অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, আহম্মদ সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা অয়ন ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন এবং সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করেছিলেন। তবে অয়ন ওসমানের সঙ্গে তার কথিত ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যদি সরকারি খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বণ্টনে প্রভাব বিস্তার করে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ ওএমএসের মতো কর্মসূচির মূল লক্ষ্যই হলো নিম্নআয়ের মানুষের কাছে নির্ধারিত মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া।
গরিবের চাল-কার্ড নিয়েও যদি বাণিজ্য হয় !
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ফ্যামিলি কার্ডকে কেন্দ্র করে টাকা নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষকে কার্ড করে দেওয়া কিংবা কার্ডের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ সত্য হলে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর অনিয়ম। কারণ রাষ্ট্র যখন দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালাচ্ছে, তখন সেই সুবিধা পেতে যদি মধ্যস্বত্বভোগীকে টাকা দিতে হয়, তাহলে সরকারি বরাদ্দের প্রকৃত সুফলভোগী কারা—সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
তদন্ত ছাড়া কি থামবে ‘কার্ডের বাণিজ্য’?
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন ডিলারের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি কোথায়? কতজন সুবিধাভোগীর নামে ওএমএস পণ্য বরাদ্দ হয়েছে, বাস্তবে কতজন পণ্য পেয়েছেন, কোনো সুবিধাভোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করলেই অভিযোগের সত্যতা অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
একইভাবে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকায় কারা রয়েছেন, তাদের কার্ড কীভাবে হয়েছে, কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে কি না এবং কার্ড প্রদানের সঙ্গে আহম্মদের কোনো আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন
ওএমএস ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট খাদ্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে অভিযোগ যাচাই করার। প্রয়োজনে সুবিধাভোগীদের সরাসরি বক্তব্য নিয়ে, ডিলারের বিক্রয় রেজিস্টার, বরাদ্দের হিসাব, সুবিধাভোগীর তালিকা ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ডিলারের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি এতদিনের কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ অডিটও প্রয়োজন। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্তের মাধ্যমেই আহম্মদও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ পাবেন।
সরকারি সহায়তার পণ্য গরিব মানুষের অধিকার—কোনো ডিলার বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়। সেই অধিকার পাইয়ে দেওয়ার নামে যদি টাকা আদায়ের অভিযোগ সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এটি শুধু একজন ডিলারের অনিয়ম নয়; বরং সরকারি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর আঘাত। সস্তাপুর ও কায়েমপুরের অভিযোগ তাই দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।




