খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ১১ বছরের তানিয়া। শীর্ণ শরীরজুড়ে পোড়া ও আঘাতের চিহ্ন। মাথায় একাধিক সেলাই, পিঠে গভীর ক্ষত। দীর্ঘদিনের নির্যাতনে পা দুটিতেও পচন ধরেছে। অপুষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়া শিশুটি ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছে না। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক, শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা।
দেড় বছর আগে গৃহকর্মীর কাজের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল তানিয়াকে। অভিযোগ, সেখানে তাকে দিনের বেশিরভাগ সময় টয়লেটে আটকে রাখা হতো, ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। সম্প্রতি মাথা ও থুতনিতে গুরুতর আঘাতের পর তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে শুক্রবার রাত ৩টার দিকে বাবা বেলাল হোসেন তাকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
তানিয়ার বাড়ি মাটিরাঙ্গা উপজেলার আমতলী ইউনিয়নের করল্যাছড়ি গ্রামে। দিনমজুর বেলাল হোসেনের দুই মেয়ের মধ্যে সে ছোট। প্রায় পাঁচ বছর আগে তাদের মা মারা যান। তখন তানিয়া স্থানীয় একটি মাদরাসায় চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভাবের কারণে প্রায় দেড় বছর আগে প্রতিবেশী তোফাজ্জল হোসেনের মাধ্যমে তানিয়াকে গৃহকর্মীর কাজে ঢাকায় পাঠাতে রাজি হন বেলাল। তবে মেয়েকে ঢাকার কোন ঠিকানায় বা কার কাছে নেওয়া হচ্ছে, তা জানতেন না তিনি।
প্রথমে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড বড় মসজিদসংলগ্ন একটি বাসায় এক নারীর কাছে তানিয়াকে রাখা হয়। পরে ওই নারী তাকে ঢাকায় তাঁর বোনের বাসায় পাঠান বলে জানা গেছে।
তানিয়ার ভাষ্য, ঢাকার মিরপুরের একটি বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছিল। বাড়ির গৃহকর্তার নাম রাসেল এবং গৃহকর্ত্রীর নাম ছোটন। রাসেলের মিরপুরে ল্যাপটপের দোকান রয়েছে এবং তাঁর স্ত্রী একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন বলেও জানিয়েছে শিশুটি।
তানিয়ার অভিযোগ, ওই বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই তাকে নির্যাতন করা হতো। শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো। দিনের বেশিরভাগ সময় তাকে টয়লেটে আটকে রাখা হতো। ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। দেড় বছর আগে ঢাকায় যাওয়ার পর একবারও মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি বাবা বেলাল।
খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, ‘শিশুটির শরীরে দীর্ঘসময় ধরে নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) মিসবাহ উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনাস্থল ঢাকায় হওয়ায় এখানে মামলা গ্রহণ বা কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।’
তবে খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশের যে স্থানেই অপরাধ সংঘটিত হোক, খাগড়াছড়ি থানা মামলাটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করতে পারে।




