নারায়ণগঞ্জ ।
,

শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন তিস্তার পেটে

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একাংশ তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট স্থাপনাও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এবড়োথেবড়ো পথ আর কাঠের সেতু পেরিয়ে স্কুলে যেত চরাঞ্চলের শিশুরা। তিস্তার ভয়াবহ ভাঙনে এবার সে স্কুলটিও নদীগর্ভে বিলীন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হলেও যথাসময়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত নদীর পেটে চলে গেল শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

জানা গেছে, চর সিঙিজানি গ্রামের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের উদ্যোগে ১৯৯২ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৯৩ শিক্ষার্থী ও চার শিক্ষক রয়েছেন। চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য এটিই ছিল একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

স্থানীয়রা জানান, তিস্তার ভাঙনে আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকেই বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে সময়মতো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।

সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এতে বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আশায় ছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু সেই আশাও পূরণ হয়নি।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকে শুরু হওয়া তিস্তার ভাঙনে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে থাকা ইংরেজি ‘আই’ আকৃতির দুটি টিনশেড ভবনের পূর্ব প্রান্ত নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট স্থাপনা সরিয়ে নিতে জেনারেটর চালু করা হয়েছে। শ্রমিক ও স্থানীয়রা টিনশেড ঘর দুটি খুলে সরিয়ে নিচ্ছেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, চরাঞ্চলে লেখাপড়ার জন্য আর কোনো স্কুল নেই। এই বিদ্যালয়টিই তাদের একমাত্র ভরসা। সেটিও নদীতে বিলীন হওয়ায় পড়াশোনা নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছে।

কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব মো. আব্দুর রহিম বলেন, ভোরের দিকে ভাঙন শুরু হলে ইউএনও ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু বিকেলের দিকে জিও ব্যাগ আসার আগেই সব শেষ হয়ে যায়।

স্থানীয় মেম্বার মো. হাবিজার রহমান বলেন, ‘স্কুলটি রক্ষা করতে কর্তৃপক্ষকে বারবার অনুরোধ করা হয়েছে। আজ ২০ ব্যাগ জিও ব্যাগ ফেলায়, পরে আর কিছুই করার ছিল না। এভাবেই স্কুলটি গেল।’

সোমবারও বিদ্যালয়ে ক্লাস হয়েছে জানিয়ে প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে বিদ্যালয়টি আমার প্রাণের সঙ্গে গেঁথে আছে। কিন্তু এটি যে এভাবে বিলীন হয়ে যাবে, তা কখনো ভাবিনি। এর আগে জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারাও এসে পরিদর্শন করে গেছেন। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এখন বিদ্যালয়ের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’

বিদ্যালয়টি দ্রুত অন্য কোনো উপযুক্ত স্থানে পুনঃস্থাপনের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মন বলেন, ‘মঙ্গলবার সেখানে ছিলাম। আজ আবারও যাচ্ছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘ভাঙন শুরু হওয়ায় স্কুলের সবকিছু খুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দিয়েছি। এর আগেও ভাঙন দেখা দিলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছিলাম।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘গতকালও সেখানে ভাঙন ছিল না। খবর পাওয়া মাত্র জিও ব্যাগ ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় চরাঞ্চলের ৯৩ শিক্ষার্থীর পড়াশোনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুত বিকল্প স্থানে বিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >