বুধবার ২৭ মে; চাঁদ রাত তথা ঈদের আগের দিনের সকালটা হয়তো বিশেষ রোমাঞ্চ নিয়েই শুরু হয়েছিল সুজন ও তার স্ত্রী সন্তানদের| তা হবেই না কেন! দিন গড়িয়ে রাতের আঁধারটুকু কেটে গেলেই যে ঈদ উৎসব! ঘড়ির কাটাটাও হয় তো সেই মাহেন্দ্রক্ষনের দিকে দ্রুত ছুটছিলো সেদিন| উৎসবের দিনটিকে রাঙিয়ে তুলতে প্রিয়তমা স্ত্রী সন্তানদের রঙিন পোশাকে আবৃত করার ¯^প্ন বুনেছিলেন খেটে খাওয়া এই দিন মজুর|
কিন্তু দিনের নীল রঙা সেই আকাশ দেখে তিনি কী মোটেও ভেবে ছিলেন- এ-ঘড়ির কাটার সাথেই ধেয়ে আসছে তার জীবনের ঘুঁটঘুঁটে এক ‘কালো রাত’| সন্ধ্যার আভায় আকাশের কোণে যেই চাঁদ দেখে ঈদের খুশিতে মেতেছিলেন, খানিক পরে সেই চাঁদের আলোতেই যে আঁধারে ডুবতে যাচ্ছে তার লালিত ¯^প্ন! রাস্তায় অপেক্ষমান এক সর্বনাশা ‘ঝড়’ নিঃশেষ করে দিতে যাচ্ছে তার তিলে তিলে গড়ে তোলা সাজানো-গোছানো এই সংসার; কেড়ে নিতে যাচ্ছে প্রিয়তমা স্ত্রী ও কলিজার টুকরো শিশু পুত্রটিকে! বিধাতা তার নিয়তিতে এমন শোক-কাব্য লিখে রাখবেন, তা কী মোটেও ভেবেছিলেন কখনও?
এ যে জগৎ বিধাতার নিয়ম বলে কথা! ভাগ্যের লিখন খন্ডায়; এই সাধ্য কার? না… সুজন মিয়ারও নেই| তাই তো স্ত্রী-সন্তানদের গায়ে নতুন রঙিন পোশাক জুড়ে দেয়ার বাসনায় ঘর থেকে বের হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মুড়িয়ে দিয়েছেন তিন টুকরো সাদা কাপড়ে| আর তার নিজের বুক ভাসিয়ে পরিহিত জামা রঙিন করেছেন স্ত্রী-সন্তানের তাজা রক্তের প্রতিটি ফোটায় ফোটায়| ঘরে ফেরার কথা থাকলেও নিজ হাতে তাদের রেখে এসেছেন গোরস্তানের সেই মাটির বিছানায়|
নরসিংদীতে চাঁদরাতে ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় চোখের সামনে যখন স্ত্রী-পুত্রকে রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেছেন, তখন তাদের বাঁচানোর তাগিদে নিজ কাঁধ ও বুকে তুলে নেয়ার যেই হৃদয় বিদারক দৃশ্যের রচনা করেছেন এই সুজন- তা দাগ কেটেছে গোটা দেশবাসীর হৃদয়ে| এই দৃশ্য শোকে স্তব্ধ হয়েছে নেটিজেনরাও|
কেউ কেউ বলছেন, স্ত্রীর নিথর দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে রক্তাক্ত শিশুর কোমল দেহখানি বুকে তুলে নেয়ার পরও বেঁচে থাকা ৫ বছর বয়সী কন্যা শিশুটির কাঁপতে থাকা সেই মলিন হাতটি নিজ হাতে শক্ত করে ধরে যেভাবে পায়ে হেঁটে হাসপাতালে ছুটেছেন সুজন, তাতে যেন ফুঁটে উঠেছে- ¯^প্নের এই সংসারটি গড়ে তুলতেও নিজ জীবন যুদ্ধেও কতটা লড়ে গেছেন এই যুবক| অথচ, সেই ¯^প্ন ভেঙে নিজ চোখের সামনেই বিলিন হয়েছে প্রিয়জনদের রক্তের ফোয়ারায়|
সুজন ও তার একমাত্র কন্যা সন্তান জীবন চক্রে হয়তো বেঁচে আছেন, তবে সব হারিয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রনা যে কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও বেশি পীড়া দায়ক হতে পারে, কঠিন সেই বাস্তবতারই যেন এক জ্বলন্ত সাক্ষি হয়ে আছেন সুজন ও তার ৫ বছরের শিশু কন্যাটি|
তারা কাঁদছেন…. কেঁদে যাবেন বাকিটা জীবন| হয়তো চোখের অশ্রু ফুড়ালেও হৃদয়ের অশ্রু বইবে অঝোরে.. তবে সেই অশ্রুর কী সাধ্য আছে হৃদয়-গহীনের সেই ক্ষত সারাবার? এমন অব্যাক্ত হাজারো প্রশ্নগুলোর না পাওয়া উত্তর যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে বাবা-মেয়েকে|
উল্লেখ্য, ঈদের কেনাকাটার জন্য স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে গত বুধবার (২৭ মে) নরসিংদী শহরে এসেছিলেন সুজন মিয়া| মনের খুশিতে কেনাকাটা শেষে রাত সাড়ে ৮টার দিকে নরসিংদী রেলস্টেশনে আসেন তারা|
রেললাইন পার হয়ে হাজেরা টাওয়ারের সামনে থেকে বাড়ির উদ্দেশে অটোরিকশায় উঠার কথা ছিল তাদের| স্টেশনে এসে তারা দেখেন, ঢাকাগামী আন্তঃনগর মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেন দীর্ঘক্ষণ ধরে স্টেশনের ১ ন¤^র প্ল্যাটফর্মে থেমে আছে| অন্য অনেকের মতো তারাও মহানগরের একটি বগির দরজা দিয়ে উঠে অন্য দরজা দিয়ে নামেন| সুজনের স্ত্রী সাথী বেগমের কোলে ২ বছরের ছেলে হাছেন|
এ সময় হাছেনকে নিয়ে প্রথমে নামেন সাথী| ৫ বছর বয়সী মেয়ের হাত ধরে পেছনে পেছনে যাচ্ছেন বাবা সুজন মিয়া| ওই সময় আন্তঃনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেনটি দ্রুতগতিতে ঢাকার দিকে যাচ্ছিল| ট্রেনের ধাক্কায় কোলে থাকা হাছেনসহ সাথী বেগম ছিটকে পড়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত পান|
এ সময় স্ত্রীকে কাঁধে ও আদরের সন্তানকে বুকে জড়িয়ে সুজন ছুটেন হাসপাতালে| ১০০ শয্যাবিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সুজন স্ত্রী ও সন্তানকে নিলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন| চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আসার আগেই তাদের মৃত্যু হয়েছে|
এ ঘটনার একটি ভিডিও চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে| ওই ভিডিওতে দেখা যায়, আহত স্ত্রীকে কাঁধে ও এক হাত দিয়ে ছেলে হাছেনকে বুকে জড়িয়ে ধরে এবং অন্য হাতে মেয়েকে ধরে দ্রুত হাসপাতালে ছুটছেন সুজন|
স্ত্রী-ছেলেকে হারিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই কান্নায় ভেঙে পড়েন সুজন মিয়া| বলেন, ‘চোখের সামনেই আমার অবুঝ শিশুসন্তান আর স্ত্রীকে হারালাম| ডাইরেক্ট ট্রেন আসতে দেখে চিৎকার করছিলাম, আটকানোরও চেষ্টা করেছি, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি|’





