নারায়ণগঞ্জ । মঙ্গলবার
২৬শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ,
১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সড়কে ঝরল ২৪ প্রাণ ঈদযাত্রার প্রথম দিনে

ঈদুল আজহার ছুটির প্রথম দিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে টাঙ্গাইলে। ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন নিম্ন আয়ের ১৫ জন। আহত হয়েছেন অন্তত ৯ জন। এছাড়া বগুড়া, গোপালগঞ্জ, নওগাঁর পত্নীতলা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও মুন্সীগঞ্জে পৃথক দুর্ঘটনায় আরো ৯ জন নিহত হয়েছেন। ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রার শুরুতেই এসব দুর্ঘটনায় বিভিন্ন জেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫

সোমবার ভোরে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় রডবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। আহত হন ৯ জন। আহতদের মধ্যে পাঁচজন টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে ১০ জনই নওগাঁর মান্দা উপজেলার তিন গ্রামের বাসিন্দা। তারা হলেন রাজেন্দ্রবাটি গ্রামের তারেক জিয়া (২১), বাদশা মিয়া (৩০), আব্দুল বারিক (২০), সোহাগ হোসেন (২১), রবিউল ইসলাম (২৮) মাইনুল ইসলাম (৩০) ও সাগর হোসেন (২০), পাকুড়িয়া গ্রামের সহোদর মাইনুর রহমান (২৫) ও গিয়াস উদ্দিন (২২) এবং মশিদপুর গ্রামের সুজন আলী (৩৫)। এছাড়া অন্যরা হলেন নওগাঁর নেয়ামতপুর উপজেলার সারিকুল (২৫), রাজশাহীর তানোর উপজেলার ইসমাইল হোসেন (১৯), চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নজরুল (৬০), সদর উপজেলার মামুন (৪৫) এবং নাটোরের লালপুর উপজেলার মোহাম্মদ আলম মোল্লা।

পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা রডবোঝাই ট্রাকটি যাত্রী নিয়ে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছিল। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান যাত্রীরা।

নিহতদের বেশিরভাগই নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তারা নোয়াখালীর চৌমুহনী এলাকায় ভাঙ্গারি মোবাইল ফোন কেনাবেচার কাজ করতেন। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফিরতে জনপ্রতি ৫৫০ টাকা ভাড়ায় রডবোঝাই ট্রাকে উঠেছিলেন তারা।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত নওগাঁর মান্দা উপজেলার আব্দুল রহিমের ছেলে আব্দুর রহমান জানান, হঠাৎ করেই ট্রাকটি দুলতে শুরু করে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেটি উল্টে যায়। এরপর চারদিকে চিৎকার-আর্তনাদ শুরু হয়। অনেকেই ট্রাকের নিচে চাপা পড়েন।

হতাহতদের স্বজনরা জানান, নিহত ও আহতরা সবাই নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী এলাকায় ভাঙ্গারি মোবাইল ফোন ক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ঈদুল আজহা উপলক্ষে ফেনী জেলার মহিপাল থানা এলাকা থেকে জনপ্রতি ৫৫০ টাকা ভাড়ায় রডভর্তি ট্রাকে উঠে বাড়ির উদ্দেশে যাচ্ছিলেন।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাদিকুর রহমান জানান, হাসপাতালে ১৫ জনের লাশ আনা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেও পাঁচজন এখনো হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (অতিরিক্ত) ফৌজিয়া হাবিব জানান, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা রড বোঝাই ট্রাক যাত্রী নিয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে যাচ্ছিল। এ সময় ট্রাকটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের যমুনা সেতু সংযোগ সড়কের কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যমুনা সেতু সংযোগ মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বগুড়ায় বাবা-মেয়ের মৃত্যু

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বনানী এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী এক এনজিও কর্মকর্তা ও তার চার বছরের কন্যা নিহত হয়েছেন। আহত হন তার স্ত্রী। সোমবার সকালে বনানী এলাকায় অজ্ঞাত গাড়ি মোটরসাইকেলটিকে ধাক্কা দিলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন পাবনার সুজানগরের গোপালপুর গ্রামের আনিসুর রহমান (৩৫) ও তার কন্যা আয়েশা (৪)। আনিসুর রহমান রংপুরের মহিমাগঞ্জে ব্র্যাক কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। আহত স্ত্রী পুষ্পা আক্তারকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জে বাস-মাইক্রো সংঘর্ষে নিহত এক

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার সোনাশুর এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে সোমবার দুপুরে যাত্রীবাহী বাস ও মাইক্রোর মুখোমুখি সংঘর্ষে মাইক্রোবাসের চালক নিহত হন। আহত হন অন্তত ১৫ জন।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, একটি বাস ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। পরে একটি প্রাইভেটকারও দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে। এতে বাসটি খাদে পড়ে যায় এবং মাইক্রোবাসটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আহতদের গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পত্নীতলায় অটোরিকশাকে চাপা, নিহত দুই

নওগাঁর পত্নীতলার গাহন মোড় এলাকায় দ্রুতগতির একটি ডামট্রাক যাত্রীবাহী অটোরিকশাকে চাপা দিলে অটোরিকশাটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। সোমবার রাতের এ দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন অটোরিকশা চালক আবু হাসান (৪৬) এবং যাত্রী তরিকুল ইসলাম (৪৫)। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি পালিয়ে যায়। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় মামলা করেছে।

শাহজাদপুরে পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত দুই

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন। বগুড়া-নগরবাড়ী মহাসড়কের দিলরুবা এলাকায় সিএনজি অটো ও নসিমন সংঘর্ষে সোহা (১৬) নামে এক কিশোরী নিহত হয়। একই ঘটনায় আহত হন একই পরিবারের পাঁচজন। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে সোমবার সকালে উপজেলার মশিপুর এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় ট্রাকচাপায় আহমদ (৮) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

মুন্সীগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দুই

ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়ায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকচালকসহ দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাছি উপজেলার ট্রাকচালক মো. হোসেন এবং সেনবাগ উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের হেলপার অন্তর দাস।

পুলিশ জানায়, সোমবার রাত ২টার দিকে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের দোগাছি সেনাক্যাম্পের সামনে মাওয়ামুখী লেনে একটি পণ্যবাহী ট্রাক সামনের পণ্যবাহী অন্য ট্রাককে ধাক্কা দেয়। এতে পেছনের ট্রাকে আটকা পড়ে ট্রাকচালক মো. হোসেন মারাত্মক আহত হন। পরে তাকে শ্রীনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে একই সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দড়ি বাউশিয়া এলাকায় মানাবে ওয়াটার পার্কের সামনে লেন পরিবর্তনের সময় একটি কাভার্ডভ্যানকে ধাক্কা দেয় দ্রুতগামী একটি লরি। এতে লরির হেলপার অন্তর দাস নিহত হন।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন টাঙ্গাইল ও কালিহাতি প্রতিনিধি; স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া, গোপালগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) ও পত্নীতলা (নওগাঁ) প্রতিনিধি]

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ >

এই বিভাগের আরও সংবাদ >